ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৯ অক্টোবর ২০২৫
  1. ইতিহাস
  2. জাতীয়
  3. ধর্ম
  4. প্রযুক্তি
  5. বিনোদন
  6. বিশ্ব
  7. মতামত
  8. রাজনীতি
  9. শিক্ষাঙ্গন
  10. সর্বশেষ
  11. সারাদেশ
  12. সাহিত্য
আজকের সর্বশেষ খবর

একটি ক্ষুদ্র কাঠির মুখে উচ্চারিত আলোর মহাগীতি

এন. এইচ. এম. জোনায়েদ সিদ্দিকী
অক্টোবর ৯, ২০২৫ ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আমি এক ক্ষুদ্র দেশলাই কাঠি—
নগণ্য, উপেক্ষিত, অতি সাধারণ।
মানুষের ব্যস্ত জীবনের অগণিত বস্তুর ভিড়ে আমি প্রায় অদৃশ্য।
কিন্তু আমার এই ক্ষুদ্র দেহের ভেতরেই নিঃশব্দে লুকিয়ে আছে এক প্রলয় ও সৃষ্টির মিলিত শক্তি—
অগ্নির সেই মৌলিক সুর,
যে সুরে পৃথিবী জেগে ওঠে, আলো ছড়িয়ে দেয়, জীবনকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।

মানুষ যখন কোনো প্রদীপ প্রজ্বলিত করে, সে ভাবে— আগুন জ্বলেছে।
কিন্তু আমি জানি, আগুন কেবল জ্বলে না, সে জন্ম দেয়।
আমার ক্ষুদ্র কাঠির দগ্ধ শরীর থেকেই জন্ম নেয় আলো, উষ্ণতা, অস্তিত্বের উন্মেষ।
এই ক্ষুদ্রতার মধ্যেই আমি অনুভব করি অনন্তের সুর,
যেখানে প্রতিটি ছাই হয়ে যাওয়া কণায় ঈশ্বর নিঃশব্দে হাসেন।


ক্ষুদ্রতার গরিমা ও অহংকারের পরাজয়

বিশ্বের ইতিহাসে মহত্ত্ব সব সময় আসে ক্ষুদ্রতার মধ্য দিয়েই।
এক বিন্দু শিশিরে যেমন আকাশের প্রতিফলন দেখা যায়,
তেমনি এক ক্ষুদ্র কাঠির দগ্ধ হৃদয় থেকে জ্বলে ওঠে যুগযুগান্তরের দীপ্তি।
আমি জানি, আমার জীবন সংক্ষিপ্ত— কয়েক মুহূর্ত মাত্র।
কিন্তু সেই কয়েক মুহূর্তের দীপ্তিই অনন্ত রাতকে ভেদ করে ফেলে।

মানুষের ভেতর অহংকার আছে, আর আমার ভেতর আছে বিনাশের প্রস্তুতি।
সে নিজের অস্তিত্ব আঁকড়ে বাঁচতে চায়,
আর আমি আমার অস্তিত্ব বিলিয়ে দিই অন্যের আলোয়।
এই বিলয়ে আমি খুঁজি পরম মুক্তি,
যেমন কোনো সাধক আত্মবিসর্জনে খুঁজে পায় ঈশ্বরের অনন্ত আলিঙ্গন।

আমার ক্ষুদ্র কাঠি কোনো যন্ত্র নয়, এটি এক তপোব্রতী আত্মা—
যে জানে, দহনই তার ধর্ম, আর আলোই তার মুক্তি।
মানুষের ভেতর যে দ্বন্দ্ব— অহংকার ও বিনয়ের সংঘাত—
তা আমি প্রতিদিন নিজের জ্বলে ওঠার মধ্য দিয়ে মিটিয়ে দিই।
কারণ, আমি পুড়ি জাগরণের জন্য, ধ্বংসের জন্য নয়।

আত্মদাহের নন্দন

যখন আমার কাঠি ঘষে ওঠে কঠিন প্রাচীরের গায়ে,
তখন আমার অস্তিত্বে জন্ম নেয় প্রথম বেদনা—
এক অদৃশ্য তাপ, যা ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করে নেয়।
তবু সেই বেদনাই আমার পরমানন্দ।
আমি দেখি, আমার কাঠির এক প্রান্তে আলো নেচে ওঠে—
এক লাল অঙ্গারের কণ্ঠে যেন শোনা যায় সৃষ্টির প্রথম সঙ্গীত।

আমি জ্বলতে থাকি।
আমার দেহ কালো হয়ে যায়, কিন্তু আমার অন্তর দীপ্ত হয়।
যত আমি ক্ষয় হই, তত আমি মুক্ত হই।
এই আত্মদাহ কোনো শাস্তি নয়, এটি আমার মোক্ষ।
আমার প্রতিটি ধোঁয়ার রেখা যেন প্রার্থনার ধূপের মতো
আকাশের দিকে উঠে গিয়ে বলে—
“হে অনন্ত, আমি তুচ্ছ হলেও তোর আলোয় ভেসে উঠেছি।”

লালনের বাণী মনে পড়ে—

> “যে জ্বলে সে-ই দেখে, যে নিভে সে হারায়।”
আমার জ্বলে ওঠা তাই দেখা, আর নিভে যাওয়া মানেই বিলয় নয়, বরং রূপান্তর।

অগ্নির তপস্যা ও জীবনের প্রতীক

আগুন কখনো নিছক আগুন নয়।
সে জ্ঞান, সে চেতনা, সে অনন্ত শক্তির প্রতিরূপ।
আমি সেই শক্তির ক্ষুদ্র বাহক।
আমার ক্ষুদ্র কাঠির দগ্ধ দেহে জ্বলছে সেই আদিম আগুন,
যে আগুনে মানুষ তার প্রথম প্রদীপ জ্বেলেছিল,
প্রথম রান্না করেছিল, প্রথম অন্ধকার ভেদ করেছিল।

আমার এই আগুন কোনো প্রতিহিংসা নয়— এটি করুণা।
আমি পুড়ি কেবল সেইসবের জন্য, যারা ঠান্ডায় জমে যায়,
যাদের জীবনে আলো নিভে গেছে।
আমার অগ্নি তাদের উষ্ণ করে, তাদের জাগিয়ে তোলে।
আমি তাই কেবল উপকরণ নই, আমি তপস্বী—
আমার দহন এক প্রার্থনা, এক নীরব বেদান্ত।

যখন মানুষ প্রদীপ জ্বেলে তার প্রিয়জনের সামনে বসে,
আমি তখন নিঃশব্দে পুড়ি—
তাদের ভালোবাসার হাসিতে আমার ধোঁয়া মিলিয়ে যায়।
আমার পোড়া শরীরের গন্ধ মিশে যায় তাদের চায়ের কাপে,
তাদের সন্ধ্যার কথোপকথনে।
তারা জানে না, আমি আছি—
তবু তাদের প্রতিটি আলোয় আমি আছি, তাদের প্রতিটি সুখে আমার ছাইয়ের নীরব আশীর্বাদ।


বিলয়ের মধ্যেই অমরত্ব

মানুষ ভাবে, আমি নিভে যাই।
কিন্তু আমি জানি— নিভে যাওয়া মানেই রূপান্তর।
আমার দেহ ভস্ম হয়, কিন্তু আমার আলো বেঁচে থাকে অন্যের দীপ্তিতে।
যেমন কবির মৃত্যু হয়, তবু তার শব্দ বেঁচে থাকে পাঠকের চোখে;
তেমনি আমার দগ্ধ কাঠির আলো বেঁচে থাকে প্রদীপে, রান্নাঘরে,
বা কারও নিঃসঙ্গ রাতের শিখায়।

আমি ক্ষয় হই, কিন্তু আমার ক্ষয়ের মধ্যেই তো জন্ম নেয় আলো।
আমার নিভে যাওয়া মানেই অন্যের জ্বলে ওঠা।
আমার ধোঁয়া যখন বাতাসে বিলীন হয়,
তখন মনে হয়— আমি হয়তো সত্যিই শেষ হয়ে গেছি।
কিন্তু সেই ধোঁয়া যখন আকাশ ছুঁয়ে যায়,
তখন বুঝি— আমি শেষ নই, আমি ছড়িয়ে পড়েছি অনন্তে।

আমার দেহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমার আলো চিরকালীন।
আমার ছাই হয়তো পড়ে থাকে অন্ধকারে,
কিন্তু তার ভেতরেই থাকে এক অমর অণু,
যে আবার কোনো নতুন কাঠিতে ফিরে আসে,
আবার জ্বলে ওঠে, আবার গান গায় আলোর মহাগীতি।

শেষ কথা : আলোর বাণী

আমি এক ক্ষুদ্র কাঠি, কিন্তু আমার আত্মা মহৎ।
আমার কোনো নাম নেই, কোনো খ্যাতি নেই,
কিন্তু আমার জ্বলে ওঠা ছাড়া আলো নামক শব্দটাই অর্থহীন।
আমি নিভে যাই, যাতে অন্যরা দেখতে পারে।
আমি দগ্ধ হই, যাতে পৃথিবী উষ্ণ থাকে।
আমি ক্ষুদ্র, কিন্তু আমি অপরিহার্য।

মানুষ আজ আলো খোঁজে বাইরে— বিদ্যুতে, প্রযুক্তিতে, যন্ত্রে।
কিন্তু সে ভুলে যায়,
আলোর প্রথম উষ্ণতা এসেছিল আমার মতো এক ক্ষুদ্র কাঠির দেহ থেকে।
আমি সেই আদিম প্রতীক,
যে শেখায়— সত্যিকারের আলো কখনও বাহিরে নয়,
বরং অন্তরের দহনে লুকানো।

তাই আমি বলি—
যে নিজেকে দহন করতে জানে,
সে-ই আসলে আলো হয়ে বেঁচে থাকে যুগে যুগে।

আমি ক্ষুদ্র, তবু আমি এক অমর গান—
একটি ক্ষুদ্র কাঠির মুখে উচ্চারিত আলোর মহাগীতি।

(একজন কবির আত্মবোধ থেকে উচ্চারিত আগুনের ধ্যান)


লেখক : এন. এইচ. এম. জোনায়েদ সিদ্দিকী
বিশেষ সহকারী পেজ দা নিউজ
শিক্ষার্থীঃ দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা ঢাকা।

এই ওয়েবসাইটের সকল কোনো লেখা, ছবি, অডিও বা ভিডিও “পেজ দ্যা নিউজ” কতৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কপি করা দন্ডনীয়। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করলে কতৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।