বোচাগঞ্জ গ্রাম থেকে শহরের যাওয়ার জন্য দিনের আলোয় পাওয়া যায় গরুর গাড়ি। মাঝে-মাঝে রায়পুর গ্রামের তিলক রায়ের একটা ভাঙা ভ্যান পাওয়া যায় । তিলক রায় এই ভ্যান পার্বতীপুর কাজ করতে এসে, কাজের বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে নিয়েছে ।
ভ্যানের যাত্রী সংখ্যা তিন জনের বেশী নিয়ে যেতে পারে না ।
লোকাল ট্রেন অথবা গরুর গাড়ি করে মানুষ শহরে ব্যবসা- বাণিজ্য, দোকানপাট করতে যায়।
“বোচাগঞ্জ গ্রামের মানুষের জনজীবনে দুর্ভোগ আর্থ-সামাজিক অবস্থা।” এর উপর একটা প্রজেক্টের রিপোর্ট করতে, দুইজন মেয়ে শহর থেকে,বোচাগঞ্জ গ্রামে তিন দিনের জন্য আসে।
দ্বিতীয় দিন অফিস থেকে ম্যানাজার জরুরী কল দিয়ে, তাদের দ্রুত অফিস এ যেতে বলে ।
রাতে গরুর গাড়ি বন্ধ থাকে। তাদের ট্রেনে যেতে হবে । তারা কোয়ার্টারে দারোয়ানের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে রাত সাড়ে এগারোটায় একটা ট্রেন আছে শহরে যাওয়ার । তারা সেই ট্রেনে গেলে তাদের পৌঁছাতে আনুমানিক রাত তিনটা বাজবে । সকালে দশটায় অফিস যেতে পারবে।
স্টেশনে রাত সাড়ে দশটায় আসে । স্টেশনে আসার জন্য দারোয়ান একটা গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয় অনেক কষ্টে। গরুর গাড়ির মালিক তাদের স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় ।
রাত এগারোটা। স্টেশনটা প্রায় জনমানবহীন।
লোকাল ট্রেনের কাউন্টারেও কেউ নেয় । মাথার উপর ক্ষীণ জ্যোৎস্নার আলো। বেশী দূরে দেখা যায় না । দূরে স্টেশনটা অন্ধকার দেখায়। স্টেশনটা যেন অন্ধকারে ঘুমিয়ে পড়েছে।
দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, পুরোনো তিনটি বটগাছের ডালে বাতাসে দোল খায় শুকনো পাতা।
স্টেশনের পাশে দুটো কৃষ্ণচূড়া গাছ, ফুল ঝরে পড়ে রেললাইন ছুঁয়ে আছে— যেন কেউ অন্ধকারে লাল চাদর বিছিয়ে রেখেছে আসন্ন ট্রেনের জন্য।
বটগাছের নিচের দোকান থেকে প্রদীপের আলোর ম্লান আভা দেখা যাচ্ছে । প্রদীপের আলোয় একটা টাক মাথা দেখা যাচ্ছে।
দুইজন মেয়ে বসে আছে একটা বেঞ্চে। তাদের হাতের কাছে দুইটা হ্যান্ড ব্যাগ ও একটা সুট ক্যাশ আছে।
একজনের পরনে কালো বোরখা ও মাথায় কালো হিজাব। মুখ মাস্ক।
অন্য জনের পরনে কালো বোরখা, মাথায় কালো হিজাব, মুখমণ্ডল কালো নেকাব ঢাকা। চোখে চশমা আছে । হাত-পায়ে কালো মোজা।
“পৃথিবীতে মেয়ে মানুষ চোখে যত মায়া আছে,
তার নিরানব্বই ভাগ মায়া আছে মুখমণ্ডল নেকাবে আবৃত করা, চোখে চশমা পরা কাজল কালো- বাদামি চোখের মেয়েদের চোখে।”
“পুরুষ মানুষের চোখে কোন মায়া নাই ।
বিধাতা সব মায়া দিয়েছেন মেয়ে মানুষের চোখে”।
“মুখে মাস্ক পরলে মুখের গড়নে সৌন্দর্য ফুটে ওঠে না।এটা সেফ ফ্যাশন দেখায়। মেয়ে মানুষের চোখে যে মায়া থাকে সেটা ও থাকে না ।
একজন ছেলে মানুষ কে আর্কষণ করে মেয়ে মানুষের চোখের মায়া।”
স্টেশনে কেউ নেয় দেখে একাই ভয় হচ্ছে—
দূরের দোকান থেকে চা-এর কাপে ধোঁয়া উঠছে।
ঠিক তখনই দেখা গেল—
একটা ছোট ছেলে আর মেয়ে, ছেঁড়া জামা পরে,
তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে ঘুম, তবু মুখে হাসি।মেয়েটা বলল,”আপা, ফুল নিবেন? জ্যোৎস্নার ফুল— আজ ভোরে পুকুর থেকে তুলছি।”
চশমা পরা মেয়েটা চমকে তাকাল।
“জ্যোৎস্নার ফুল!”এগুলো তো কদমফুল, হাসনাহেনা এবং শাপলা ফুল।
ছেলেটা হেসে বলল,
“আপা আমরা ফুলের নাম জানি না ।
প্লাটফর্মে দুটি গাছ আছে, সেই গাছের ফুল। সকালে কাছ থেকে পাড় ছিলাম।
শাপলা ফুলকে দেখিয়ে বলল — এটা পাশের পুকুর থেকে তুলেছি।
আমাদের মায়ের নাম জ্যোৎস্না, তাই আমরা এই ফুলের নামও ‘জ্যোৎস্নার ফুল’ দিয়েছি।”
মেয়ে গুলো দুজনেই একে অন্যের দিকে তাকাল— নীরবতা নেমে এল।
মাস্ক পরা মেয়েটি জিজ্ঞেসা করল, “তোমাদের বাবা- মা নেই?” মেয়েটি বলল —
“মা মারা গেছে, বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে করেছে । তাদের কে সৎমা দেখতে পায় না ।
তাই এখন তারা স্টেশনেই থাকে।
রেলগাড়ির শব্দই তাদের লোরি, প্ল্যাটফর্মই তাদের বিছানা।
মেয়েরা তাদের কিছু টাকা দিল, ফুল নিল না।
ছেলে-মেয়েরা বলল,
“টাকা দিলে ফুলও নিতে হবে আপা, না নিলে ফুল কাঁদবে।”
চশমা পরা মেয়েটা নরম গলায় বলল,
“ঠিক আছে, দাও। জ্যোৎস্নার ফুল আমি রাখব।”
ছেলে-মেয়েরা ফুল দিয়ে গিয়ে প্লাটফর্মে ঘুমিয়ে পড়ল ।
কিছুক্ষণ পর পাশের বটগাছের ছায়া থেকে এক পাগল চিৎকার করে উঠল।
মাস্ক পরা মেয়েটা ভয়ে কেঁপে উঠল।
পাগলটা হাসতে হাসতে বলল—
“ট্রেন আসবে না আজ! ট্রেন খেয়ে ফেলেছে বটগাছ!”লোকজন নেই বললেই চলে, ভয় ছেয়ে গেল মুহূর্তে।
একজন লোক এগিয়ে এল। চেহারা ক্লান্ত, চোখে ধুলো, হাতে একটা পুরোনো ব্যাগ।
তিনি বললেন, — “ভয় পাবেন না আপারা, এই লোকটা নিরীহ। মাঝে মাঝে এমন করে।”
মেয়েরা ধন্যবাদ জানাল, ব্যাগগুলো প্ল্যাটফর্মে তুলতে সাহায্য চাইল। তারা টাকাও দিল, কিন্তু লোকটির দিকে না তাকিয়ে।
লোকটি চুপচাপ চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই আবার ফিরে এল, হাতে এক কাপ চা, হাতে একটা সিগারেট নিয়ে আসে। এসে বলল—
“আপনাদের কাছে সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার হবে ?”
চশমা পরা মেয়েটি বলল — “এটা কোন ধরণের অসভ্যতামি? সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার চাচ্ছেন মেয়ে মানুষের কাছে ।”
লোকটি বলল— “আহা: আপনি বোধ হয় বিরক্ত হচ্ছেন ?”
আমি কিন্তু আপনাকে একেবারেই বিরক্ত করছি না । আমার কাছে লাইটার নেই তাই আপনাদের বলছি ।
মাস্ক পরা মেয়েটি বলল—
“লাইটার আপনি দোকানে নিতে পারেন নাই ?”
লোকটি বলল —
“পারতাম কিন্তু আমি নেয় নাই । কারণ আপনাদের আমার ও ইচ্ছে হচ্ছে ভয় দেখানোর।”
চশমা পরা মেয়েটি বলল — “কেনো ?”
লোকটি বলল — “এই যে সিগারেট এবং চা খাচ্ছি তা আপনাদের টাকাই অথচ আপনারা আমাকে চিনতে পারেন নাই এজন্য ভয় দেখানোর ইচ্ছে করে ।” এটাই পৃথিবীর নিয়ম, আপা। ভয় আসে কাছের মানুষ থেকেই।”
মেয়েরা একে অপরের দিকে তাকাল।
মাস্কের নিচে হালকা হাসি, নিকাবের ভেতর থেকে এক দীর্ঘ নিশ্বাস।
তাদের মনে হলো, লোকটা হয়তো পাগল নয়— বরং জীবনের এক অভিজ্ঞ যাত্রী।
এরপর ট্রেনের বাঁশি শোনা গেল দূরে,
বাতাসে ধুলো উড়ে উঠল, আবার ঘুম থেকে উঠে বাচ্চা দুটি দৌড়ে গেল ফুল হাতে।
মেয়েরা ট্রেনে উঠল, জানালার পাশে বসে বাইরে তাকাল— দেখল জ্যোৎস্নার আলোয় বাচ্চাগুলো এখনো হাত নাড়ছে,
তাদের ফুলের পাপড়িতে আলো ঝলমল করছে।
চশমা পরা মেয়েটা মৃদু গলায় বলল,
“ওরাই সত্যি জ্যোৎস্নার ফুল।”

