পেজ দ্যা নিউজ
আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন
সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
শিরোনাম
লিঙ্ক কপি হয়েছে!

‘বিজয়ী’ শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি পরিবর্তনের নাম

পেজ দ্যা নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: ১১ মে ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথে নারীর অংশগ্রহণ আজ আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সেই বাস্তবতা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময়, যখন বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন বাংলাদেশের অনেক তরুণ-তরুণী নতুন করে ভাবতে শিখেছেন— কীভাবে ঘরে বসেই আয়ের পথ তৈরি করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তা সংস্কৃতি, যেখানে নারীরা হয়ে ওঠেন পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। চাঁদপুরের ‘বিজয়ী নারী উন্নয়ন সংস্থা’ এই পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

চাঁদপুরের এক সাহসী নারী উদ্যোক্তা তানিয়া ইশতিয়াক খান এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন, ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক দিক-নির্দেশনা থাকলে নারীরা শুধু নিজেদের ভাগ্যই নয়, বরং সমাজের চিত্রও বদলে দিতে পারেন।
নিজের উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ব্যাংকে চাকরি করতাম। একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত ছিল। কিন্তু আমি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলাম, তা সহজ ছিল না। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে একটি নারী উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক— ‘বিজয়ী’ তৈরি করেছি।
‘প্রথমে অনেকেই আমার এমন উদ্যোগকে নিছক পাগলামি বললেও এখন সবাই সমর্থন দেয়, অনুপ্রেরণা দেয়। ভবিষ্যতে এটিকে আমি আরও বড় করতে চাই।’

শুরুর দিনগুলোর কথা জানিয়ে তানিয়া জানান, ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর শহরের পুরান বাজারে ‘বিজয়ী নারী উন্নয়ন সংস্থা’র যাত্রা শুরু হয়। শুরুটা ছিল ছোট পরিসরে, কিন্তু লক্ষ্য ছিল অনেক বড়— নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। প্রতিষ্ঠার পেছনে সার্বিক সহযোগিতা করেন আশিক খান, আর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন তানিয়া ইশতিয়াক খান।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে, যা এর জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতারই প্রমাণ।’

জানা যায়, সংগঠনটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে পিছিয়ে পড়া ও হতাশাগ্রস্ত নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। সমাজে অনেক শিক্ষিত নারী আছেন, যারা উপযুক্ত সুযোগের অভাবে নিজেদের প্রতিভা কাজে লাগাতে পারেন না। ‘বিজয়ী’ সেই নারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে দক্ষতা উন্নয়নের চাবিকাঠি।

এক প্রশ্নের উত্তরে উদ্যোক্তা তানিয়া ইশতিয়াক খান বলেন, বিনামূল্যে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নানা ধরনের কাজ শিখছেন— যেমন কেক বেকিং, হ্যান্ডমেইড জুয়েলারি তৈরি, ব্লক ও বাটিক, হ্যান্ড পেইন্ট, ফাস্টফুড আইটেম তৈরি ইত্যাদি। এমনকি অনলাইন ব্যবসা পরিচালনার কৌশলও শিখছেন তারা।

করোনাকালেই ‘বিজয়ী’ প্রথম অনলাইনভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে। যখন মানুষ ঘরবন্দি, তখন এই উদ্যোগ নারীদের জন্য হয়ে ওঠে আশার আলো। ঘরে বসেই তারা শিখেছেন নতুন নতুন দক্ষতা, তৈরি করেছেন পণ্য ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করে আয় করেছেন। করোনা পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংগঠনটি অফলাইনেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে, যা আরও কার্যকরভাবে নারীদের দক্ষ করে তুলছে।

‘বিজয়ী’ শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েই থেমে থাকেনি। তারা নারীদের জন্য তৈরি করেছে একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস, যেখানে উদ্যোক্তারা নিজেদের পণ্য সহজেই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। ‘বিজয়ী নারী উদ্যোক্তা তৈরির প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ সদস্য একত্রিত হয়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করছেন। এই প্ল্যাটফর্ম নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহায়ক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করেছে।

তানিয়া ইশতিয়াক খান মনে করেন, নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘নারীরা যদি তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ না হয়, তাহলে তারা পিছিয়ে পড়বে। তাই আমরা তাদের শুধু পণ্য তৈরি শেখাই না, বরং কীভাবে সেই পণ্য অনলাইনে বিক্রি করতে হয়, সেটাও শেখাই।’ এই দৃষ্টিভঙ্গিই ‘বিজয়ী’কে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

সংগঠনটি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যবস্থাও করছে। অনেক নারী ব্যবসা শুরু করতে চান, কিন্তু পুঁজি না থাকায় পিছিয়ে যান। ‘বিজয়ী’ তাদের ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের সম্মাননা ও সনদ প্রদান করা হয় ‘বিজয়ী অ্যাওয়ার্ড’— এর মাধ্যমে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নারীদের শুধু অনলাইনে নয়, অফলাইনেও ব্যবসার সুযোগ করে দিতে ‘বিজয়ী’ আয়োজন করে ‘বিজয়ী মেলা’। এই মেলায় উদ্যোক্তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্টল পেয়ে তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পান। এতে তারা সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন ও বাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

সংগঠনটির আরেকটি মানবিক দিক হলো সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ‘বিজয়ী’ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং একটি মানবিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে বলে জানান তানিয়া।

তানিয়া ইশতিয়াক খানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত। তিনি বলেন, চাঁদপুরের গণ্ডি পেরিয়ে এই উদ্যোগ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নারী উদ্যোক্তা তৈরি করে একটি শক্তিশালী জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য।

তানিয়া ইশতিয়াক খান বিশ্বাস করেন, নারীরা যদি নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে, তাহলে তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হবে না, বরং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করবে।

বর্তমান সরকারের সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ এই ধরনের কার্যক্রমকে আরও সহজ করে দিয়েছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রসার নারীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ‘বিজয়ী’ সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

‘আমরা নহে দেবী, নহে সামান্য নারী। আমরা নারী, আমরাই পারি, আমরাই বিজয়ী’— এই শ্লোগানকে ধারণ করে সংগঠনটি এগিয়ে যাচ্ছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে। এটি শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং একটি আন্দোলন— নারীর আত্মমর্যাদা, স্বাবলম্বিতা ও ক্ষমতায়নের আন্দোলন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘বিজয়ী নারী উন্নয়ন সংস্থা’ একটি অনন্য উদ্যোগ, যা নারীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সুযোগ পেলে নারীরা যে কোনো বাধা অতিক্রম করে সফল হতে পারে। আর সেই সফলতার গল্পই আজ ছড়িয়ে পড়ছে চাঁদপুর থেকে সারাদেশে।

‘বিজয়ী’ শুধু একটি সংগঠন নয়— এটি একটি স্বপ্ন, একটি প্রতিশ্রুতি ও একটি পরিবর্তনের নাম। নারীদের হাত ধরে গড়ে উঠছে এক নতুন বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নারী হবে আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী ও সফল। এই পথচলায় ‘বিজয়ী’ হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।