সোশ্যাল মিডিয়ার বিচারালয়: সুবিচার নাকি উন্মত্ত জনতার উল্লাস?
একটি ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ, আংশিক কাটা স্ক্রিনশট, কিংবা কারও বিরুদ্ধে তোলা একতরফা অভিযোগ। ব্যস, ফেসবুকের নিউজফিডে বিস্ফোরণ ঘটতে এটুকুই যথেষ্ট। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার শেয়ার, লাখো মন্তব্য, আর সেই ব্যক্তির ইনবক্স ভরে যায় অকথ্য গালিগালাজ ও হুমকিতে। কেউ যাচাই করার প্রয়োজনবোধ করল না ঘটনাটির পেছনের সত্য কী ছিল। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল এজলাসে বিচার ততক্ষণে শেষ; রায়ও ঘোষণা হয়ে গেছে।
আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে আইনের শাসন বা প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ‘পাবলিক ট্রায়াল’ বা প্রকাশ্য গণশুনানির সংস্কৃতি। ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইউটিউব পরিণত হয়েছে একেকটি স্বঘোষিত আদালতে, যেখানে যে কেউ একই সাথে বাদী, আইনজীবী এবং বিচারক।
এই সংস্কৃতির উত্থান কিন্তু হঠাৎ করে হয়নি। প্রচলিত বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি এবং সাধারণ মানুষের আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। মানুষ যখন দেখে থানায় গিয়ে বিচার পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়, তখন সোশ্যাল মিডিয়াকে তাদের কাছে তাৎক্ষণিক সমাধান মনে হয়। এখানে পোস্ট দিলে ভাইরাল হওয়া যায়, প্রশাসনের টনক নড়ে, কখনো কখনো দ্রুত পদক্ষেপও নেওয়া হয়। এই আপাত ‘সাফল্য’ মানুষের মনে এক ধরনের মিথ্যা ধারণা তৈরি করেছে যে সোশ্যাল মিডিয়াই বুঝি আসল মুক্তির জায়গা।
কিন্তু এই ভার্চুয়াল বিচারের অন্ধকার দিকটি অত্যন্ত ভয়াবহ। কোনো আদালতের মৌলিক ভিত্তি হলো দুটি পক্ষকেই কথা বলার সমান সুযোগ দেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি হলো অ্যালগরিদম ও মানুষের ক্ষোভ। এখানে যত বেশি রাগ, তত বেশি শেয়ার ও এনগেজমেন্ট। ফলে সত্য উদ্ঘাটন নয়, বরং কাকে কত দ্রুত খলনায়ক বানানো যায়, সেই প্রতিযোগিতাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।
একটি আংশিক সত্য বা সম্পূর্ণ অসত্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কারও চাকরি চলে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের সংসার, এমনকি লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকে। পরবর্তীতে যদি প্রমাণিতও হয় যে ব্যক্তিটি নির্দোষ ছিলেন, ততক্ষণে তার সামাজিক সম্মান, মানসিক স্থিতি ও রুটিরুজি সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যায়। অথচ সেই ক্ষতিকর জনতা ততক্ষণে নতুন কোনো ‘শিকার’ খুঁজে নিয়ে পরবর্তী বিচারের আয়োজন সেরে ফেলেছে। কারও ভুলের মাশুল এমন একপেশে সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞ হতে পারে না।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বিচারালয় নাগরিকের মাঝে তৈরি করছে একটি নিষ্ঠুর মানসিকতা। স্ক্রিনের পেছনে নাম গোপন রেখে বা নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রেখে অন্যকে ধ্বংস করার যে মানসিক আনন্দ, তা সমাজে সহমর্মিতা ও যুক্তিবোধকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
অন্যায় দেখে প্রতিবাদ জানানো নাগরিকের অধিকার, কিন্তু সেই প্রতিবাদ যেন উন্মত্ত জনতার উল্লাসে পরিণত না হয়। আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি কিবোর্ডের বোতাম চেপে কাউকে সামাজিকভাবে ফাঁসিতে ঝোলানোও কোনো সুবিচার নয়।
সোশ্যাল মিডিয়া থাকুক জনমত গঠনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, আদালতের বিকল্প হিসেবে নয়। কোনো তথ্য দেখেই অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে আমাদের অন্তত এক মুহূর্ত থামতে হবে, যাচাই করতে হবে। কারণ আজ যে ভিড়ে দাঁড়িয়ে আমরা অন্যের ওপর পাথর ছুড়ছি, কাল মিথ্যা কোনো অভিযোগে সেই কাঠগড়ায় আমি বা আপনিও দাঁড়িয়ে যেতে পারি। সেই দিন হয়তো আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই আমাদের আর অবশিষ্ট থাকবে না।
