উপন্যাস: মালতী
প্রথম পর্ব : প্রথম অনুচ্ছেদ
যতীন দেবনাথ আজিজুল হক চৌধুরীর বাড়িতে একজন গরুর রাখাল হিসেবে কাজ করত। তার সংসারে ছিল স্ত্রী নীরদা দেবনাথ, এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে-মেয়ে তখনও ছোট। সংসারে ছিল চরম টানাপোড়ান। যতীনের সামান্য আয়েই কোনোমতে দিন চলে যেত।
একদিন শীতের এক সন্ধ্যায়, গোয়ালঘরে গরু ঢোকানোর সময় একটি আড়িয়া গরু হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই গরুটি যতীনের বুকের বাঁ পাঁজরে ভয়ংকরভাবে গুঁতো মারে। যতীন চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তার চিৎকার শুনে আজিজুল হকের স্ত্রী আয়েশা বেগম ও কাজের লোক রমজান আলী দৌড়ে আসে। দ্রুত যতীনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানায়—তার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। সে আর কোনোদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।
প্রায় তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসা চলে। যতীন বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। একদিন রাতে ঘুমের মধ্যেই নিঃশব্দে তার বাঁচার লড়াই থেমে যায়। যতীন দেবনাথ মারা যায়।
স্বামীর মৃত্যুর পর নীরদা দেবনাথ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ছোট ছোট সন্তানদের মুখের দিকে তাকালে তার বুকের ভেতর হাহাকার জমে ওঠে। নীরদার বাবা-মা, ভাই-বোন—কেউই ছিল না। দিনের পর দিন শোক তাকে গ্রাস করে রাখে। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে সে শোক সামলে নিয়ে জীবনযুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে।
নীরদা ছিল গ্রামের ভেতর এক অপূর্ব সুন্দরী নারী। তার সৌন্দর্যে ছিল স্বাভাবিক দীপ্তি, চোখে ছিল গভীরতা। স্বামীর মৃত্যুর পর সে আজিজুল হক চৌধুরীর বাড়িতে কাজ নেয়। সকালবেলা গরুর গোয়ালঘর পরিষ্কার করা দিয়েই তার দিনের শুরু।
আজিজুল হক ছিলেন একজন চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি নীরদাকে রাস্তায় মাটি কাটার চল্লিশ দিনের কর্মসূচির কাজ দেন। নীরদা প্রতিদিন সকালে গোবর পরিষ্কার করে মাটি কাটতে যায়। যেদিন মাটি কাটার কাজ থাকে না, সেদিন সে গ্রামেই বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে।
রোদে ধান শুকানো, পোয়াল সংগ্রহ, নেড়া কুড়ানো, কাঁথা সেলাই, ভাপা পিঠা বানানো—এমন কোনো কাজ নেই যা সে করে না। সন্তানদের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য নীরদা নিজের শরীর আর শক্তিকেই শেষ সম্বল করে সংসার টেনে নিয়ে যায়।
নীরদার ছেলে বিমল ও মেয়ে মালতী। বিমলের বয়স নয় বছর। সংসার চালাতে সে একজন কর্মকারের দোকানে দা-বঁটি, কাস্তে, কুড়াল ও বসলা বানানোর কাজ শেখে। মালতীর বয়স ছয় বছর। বিমল ও মালতী কেউই স্কুলে যায় না। নীরদা তাদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারেনি।
নীরদা কাজে গেলে মালতী বাড়িতেই থাকে। পাড়ার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সারাদিন খেলে।
একদিন সকালে মালতী তার মায়ের সঙ্গে আজিজুল হকের বাড়িতে যাওয়ার জন্য খুব কান্না করে। শেষ পর্যন্ত নীরদা তাকে সঙ্গে নিয়েই যায়। আয়েশা বেগম মালতীকে খুব পছন্দ করেন। তিনি কাজের মেয়ে লুৎফাকে মুড়ি, খৈ ও গুড় দিয়ে মালতীকে খেতে দিতে বলেন।

মালতী বারান্দার টেবিলে বসে খাচ্ছিল। তখন ঘর থেকে বের হয়ে আজিজুল হক তাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন,
“তুমি বাড়িতে একা একা সারাদিন কী কর?”
ভয়ে মালতী কোনো কথা বলে না।
আবার তিনি জিজ্ঞেস করেন,
“কোন ক্লাসে পড়ো?”
মালতী নিচু গলায় বলে,
“আমি পড়ি না।”
“সে কী! তোমার মা স্কুলে ভর্তি করায়নি?”
“না।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লুৎফা তখন বলে,
“খালুজান, আপনি কী যে বলেন! যতীন ভাই মারা যাওয়ার পর আপনি যদি ভাবীকে কাজ না দিতেন, ওরা না খেয়ে মারা যেত। পড়াশোনা তো দূরের কথা। আপনার গরুর কারণেই যতীন ভাই অকালে মারা গেল। অথচ আপনি শুধু মাটি কাটার কাজটা ছাড়া তেমন কোনো সাহায্যই করেননি। ছেলে কামারের দোকানে কাজ করে, আর মেয়েটাকে বাড়িতে রেখে গোবর পরিষ্কার করে ভাবী বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে।”
আজিজুল হক কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলেন,
“সে কী রে! এসব তো আগে জানতাম না।”
লুৎফা উত্তর দেয়,
“আপনি কিভাবে জানবেন, খালুজান? আপনি তো খুব ব্যস্ত মানুষ।”
আজিজুল হক মাথা নেড়ে বলেন,
“হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ।”
লুৎফা আবার বলে,
“নীরদা তো আমাদের বাড়িতেই সারাদিন কাজ করতে পারে, অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হবে কেন?”
আজিজুল হক সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন।
লুৎফা মালতীকে জিজ্ঞেস করে,
“তোমার নাম কী?”
“মালতী দেবনাথ।”
আজিজুল হক তখন বলেন,
“কাল থেকে তুমি স্কুলে যাবে। লুৎফা, ওর মাকে একটু ডাকো।”
নীরদা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
“পিসা, আপনি আমাকে ডাকছেন?”
আজিজুল হক বলেন,
“তোমার ছেলে-মেয়েকে স্কুলে পাঠাও না কেন?”
নীরদা চোখ নামিয়ে বলে,
“পিসা, এত টাকা কোথায় পাবো? আপনার দয়া আর মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পাই, তা দিয়েই ওদের মুখে ভাত তুলে দিই।”
আজিজুল হক বলেন,
“আমাকে আগে বলোনি কেন? কাল থেকে তোমার ছেলে-মেয়ে স্কুলে যাবে। ছেলে স্কুল থেকে এসে রহমতের সঙ্গে এখানে গরু-ছাগলের দেখাশোনা করবে। আর তুমি আর যেখানে-সেখানে কাজ করবে না, বেশির ভাগ সময় এখানেই কাজ করবে।”
নীরদা শান্ত গলায় বলে,
“আচ্ছা, পিসা।”
কৃতজ্ঞতায় নীরদার চোখ ভিজে ওঠে। সে মাথা নত করে নীরবে ধন্যবাদ জানায়।
(চলবে..)

