প্রকাশকাল: ৩ জুন ২০২৬
ডাউনলোড: ৩ জুন ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
QR Code
বিস্তারিত অনলাইনে পড়ুন
pagethenews.com /pagethenews

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় দিবস: প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও ভবিষ্যতের পথচলা

আজিজুল হক

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ, উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধারণ করার একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে শুরু হয় একাডেমিক কার্যক্রম। প্রায় দুই দশকের পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা অর্জনের সাক্ষী হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠাকালের প্রত্যাশাগুলো কতটুকু পূরণ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কী করণীয়, তা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন সময়ের দাবি।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, দর্শন ও মানবতাবাদী চেতনার চর্চা এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি বৃহত্তর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং একটি আধুনিক বহুমাত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলাও ছিল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য।

প্রথমত, উত্তর-মধ্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ ছিল একটি বড় প্রত্যাশা। সে সময় অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দেশের কয়েকটি প্রধান নগরকেন্দ্রিক ছিল। ফলে এ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ছিল সময়ের প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, নজরুলের সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার আদর্শকে গবেষণা ও শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া ছিল অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে তাঁর সাহিত্য ও দর্শনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিত করে তোলার প্রত্যাশাও ছিল।

তৃতীয়ত, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন ও সংস্কৃতিচর্চার সমন্বয়ে একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যা জাতীয় উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

চতুর্থত, ত্রিশালকে কেন্দ্র করে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল, যা স্থানীয় উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়টি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগ ও নজরুল ইনস্টিটিউট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মানবিক, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন, সংগীত, চারুকলা ও নাট্যকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে। নজরুলচর্চা, সংগীত, নাটক ও চারুকলাভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে।

গবেষণাক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। গত এক দশকে আন্তর্জাতিক জার্নালে শিক্ষক ও গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন এবং ব্যবসায় শিক্ষা ক্ষেত্রে গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হয়েছে।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। বিস্তৃত হচ্ছে অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক প্রভাবকে আরও সুদৃঢ় করছে।

আঞ্চলিক উন্নয়নেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। ত্রিশাল ও আশপাশের এলাকার অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এর ইতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে ‘নজরুল অধ্যয়ন’ কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জাতীয় কবির জীবন, দর্শন ও আদর্শ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি।

তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষণা অবকাঠামো, আন্তর্জাতিকীকরণ, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং আধুনিক সুবিধা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এখনও অনেক কাজ বাকি। বিশ্বমানের গবেষণার জন্য প্রয়োজন উন্নত গবেষণাগার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। এছাড়া বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ গবেষণা এবং বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।

আগামী দশকে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি গবেষণানির্ভর আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি, স্মার্ট ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন এবং নজরুল গবেষণাকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালের সব প্রত্যাশা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত রয়েছে।

জাতীয় কবির নামে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়া। সেই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অ্যালামনাই, নীতিনির্ধারক এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।

প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পরে এসে বলা যায়, জাককানইবি এখনও তার স্বপ্নযাত্রার পথে এগিয়ে চলেছে। এখন প্রয়োজন গতি, গুণগত উৎকর্ষ এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই বিশ্ববিদ্যালয়টি জাতীয় কবির আদর্শের এক আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।


✍️লেখক: ড. এম এম রহমান
অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত)
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।