প্রকাশকাল: ৫ জুলাই ২০২৬
ডাউনলোড: ৫ জুলাই ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
QR Code
বিস্তারিত অনলাইনে পড়ুন
pagethenews.com /pagethenews

বুকে অস্ত্রোপচারের দাগ, কাঁধে কফির ফ্লাস্ক; জীবনযুদ্ধে হার মানেননি ‘কফি ম্যান’ সোহেল

মোঃ কাজল ইসলাম

বুকজুড়ে ওপেন হার্ট সার্জারির ক্ষতচিহ্ন এখনো স্পষ্ট। চিকিৎসকের কঠোর নির্দেশ ছিল—৫ কেজির বেশি ওজন বহন করা যাবে না। কিন্তু জীবন ও জীবিকার তাগিদে সেই নিষেধাজ্ঞাকেই উপেক্ষা করতে হয়েছে সোহেল রানাকে। কাঁধে প্রায় ১০–১২ কেজি ওজনের ফ্লাস্ক আর কফি তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে কফি বিক্রি করেন তিনি। কুড়িগ্রামজুড়ে এখন তিনি পরিচিত ‘কফি ম্যান সোহেল’ নামে।

দুই বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ওপেন হার্ট সার্জারি করাতে পরিবারের ওপর নেমে আসে বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা। সুস্থ হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় কাজের চেষ্টা করলেও অস্ত্রোপচারের ইতিহাস শুনে কেউ তাকে চাকরি দিতে আগ্রহী হয়নি। অনেক জায়গায় তিরস্কারও শুনতে হয়েছে।

তবে হতাশ না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন সোহেল। অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ কফি বিক্রির উদ্যোগ। প্রতিদিন সকালে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস এবং বিকেলে ডিসি পার্ক এলাকায় ঘুরে ঘুরে ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেন এক কাপ গরম কফি।

তার এই উদ্যোগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, প্রতিটি কফির কাপে ক্রেতার নামের প্রথম অক্ষর লিখে পরিবেশন করেন তিনি। ছোট্ট এই অভিনব কৌশলই ক্রেতাদের কাছে তাকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

সোহেল রানা কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের দক্ষিণ ষাট গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি তাজউদ্দীন ও সাহিদা বেগমের দ্বিতীয় সন্তান। ২০২১ সাল থেকে হৃদরোগে ভুগছিলেন। পরে পরিবার ঋণ নিয়ে তার ওপেন হার্ট সার্জারির ব্যবস্থা করে। সেই ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতেই আজ জীবনযুদ্ধে নেমেছেন তিনি।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভারী জিনিস বহন করা তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পরিবারের দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের কথা ভেবেই প্রতিদিন কাঁধে তুলে নেন কফির সরঞ্জাম।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাকিব বলেন, “সোহেল ভাই খুব পরিশ্রমী মানুষ। নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়েও হাসিমুখে কাজ করে যাচ্ছেন। যদি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি তাকে একটি ছোট দোকান করে দিতে এগিয়ে আসেন, তাহলে তাকে আর প্রতিদিন ভারী ফ্লাস্ক কাঁধে নিয়ে ঘুরতে হবে না। এতে তার স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমবে।”

সোহেল রানা বলেন, “প্রথমে রংপুরে এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম, কিন্তু তেমন সাড়া পাইনি। পরে কুড়িগ্রামে এসে নতুনভাবে শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন ভালোই চলছে। যদিও ডাক্তার আমাকে ৫ কেজির বেশি ওজন বহন করতে নিষেধ করেছেন, তারপরও পরিবারের দায়িত্বের কারণে কাজ করে যাচ্ছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। যারা আমার হাতে তৈরি কফি খেতে চান, তারা সকালে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ এবং বিকেলে ডিসি পার্কে আসতে পারেন।”

জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে হার মানিয়ে সোহেলের এই সংগ্রাম অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প। সীমিত সামর্থ্য, শারীরিক ঝুঁকি আর ঋণের বোঝা সত্ত্বেও তিনি প্রমাণ করেছেন—সততা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিকূলতার মাঝেও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।