মরেও অমর লিটন দাশ: মৃত্যুর পরও যাঁর শরীর হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠশালা
মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখে মানুষের স্মৃতিতে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এমনই এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নবীগঞ্জের লিটন দাশ তালুকদার। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ যেন আগুনে পুড়ে কিংবা মাটিতে মিশে না যায়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষা ও গবেষণায় কাজে লাগে—এই প্রত্যয়ে নিজের মৃতদেহ দান করে গেছেন হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে।
দীর্ঘদিন ধরে দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অসুস্থ ছিলেন লিটন দাশ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর জীবন হয়তো আর বেশি সময়ের নয়। কিন্তু মৃত্যুর চিন্তার মধ্যেও তাঁর ভাবনায় ছিল অন্য কিছু—মৃত্যুর পরও যেন তাঁর শরীর মানুষের কাজে আসে।
সেই ভাবনা থেকেই গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নোটারীকৃত ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে নিজের মৃতদেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য দান করার সিদ্ধান্ত জানান তিনি।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় নবীগঞ্জ পৌরসভার শিবপাশায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লিটন দাশ। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় একটি জীবনের পথচলা; কিন্তু তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আরেক ধরনের যাত্রা—চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষায় তাঁর শরীর হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠের উপকরণ।
লিটন দাশের পিতা মৃত দ্বিজেন্দ্র দাশ তালুকদার এবং মা রেখা রানী দাশ। তাঁর একমাত্র বড় ভাই দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য। ছাত্রজীবনে লিটন দাশ সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন।
মৃত্যুর পর তাঁর দেহ কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে সামাজিক নানা বাস্তবতা ও প্রচলিত ধারণা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা তাঁর দেহ নিয়ে গবেষণা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে সেই জ্ঞান মানুষের চিকিৎসাসেবায় কাজে লাগবে।
লিটন দাশের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই তাঁর দেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাবেদ জিল্লুল বারি, এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায়, ক্যাশিয়ার নারায়ণ পালসহ সংশ্লিষ্টরা আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উদ্যোগ নেন। জেলা প্রশাসনের অনুমতিও নেওয়া হয়।
দিনব্যাপী প্রক্রিয়া শেষে রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে লিটন দাশের বড় ভাই দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার ও স্বজনরা তাঁর মরদেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। কলেজের পক্ষ থেকে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সসহ নবীগঞ্জে উপস্থিত ছিলেন এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য্য, প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায় ও ক্যাশিয়ার নারায়ণ পাল।
মরদেহ হস্তান্তরের আগে বাসদ হবিগঞ্জ জেলা ও নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে লিটন দাশের কর্ম ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক চৌধুরী ফয়সল সুয়েব, বাসদ হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম, বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য কাঞ্চন চক্রবর্ত্তী, দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার, তমাল ভট্টাচার্য, নরেন্দ্র পাল, কুমারেশ চক্রবর্তী, কংকন চক্রবর্তী ও জয় চক্রবর্ত্তীসহ অন্যরা।
শ্রদ্ধা নিবেদনকালে উপস্থিত ব্যক্তিরা বলেন, লিটন দাশের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেহদানের ঘটনা নয়; এটি মৃত্যুর পরও মানুষের কাজে থাকার একটি মানবিক দৃষ্টান্ত। তাঁর সিদ্ধান্ত অন্যদেরও মানবিক ও জনকল্যাণমুখী চিন্তায় উৎসাহিত করতে পারে।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব বলেন, “আমাদের দেহ পচনশীল, কর্মটাই মূল। লিটন দাশ সেই মূল কাজটিই করে গেছেন। যে কারণে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ পরিবার আজীবন তাঁর মানবিক অবদানের কথা স্মরণ রাখবে।”
একজন মানুষের জীবন থেমে গেছে ১৩ সেপ্টেম্বর সকালেই। কিন্তু তাঁর শরীরের মাধ্যমে হয়তো আরও বহু শিক্ষার্থী চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল বিষয় শিখবে, অর্জন করবে বাস্তব জ্ঞান। সেই শিক্ষার্থীদের কেউ একদিন চিকিৎসক হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবেন—আর সেই জ্ঞানের পেছনে নীরবে অবদান রেখে যাবেন লিটন দাশ।
মৃত্যুর পরও মানুষের কাজে থাকার এমন ইচ্ছাই হয়তো একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে স্মরণীয় করে রাখে। লিটন দাশ তাঁর জীবনের শেষ সিদ্ধান্তে সেই স্মরণীয়তার পথটিই বেছে নিয়েছেন।