হারিয়াকোনা গ্রাম: গারো পাহাড়ের নিঝুম অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার গল্প
শহরের কোলাহল পেরিয়ে যতই এগিয়ে যাওয়া যায়, ততই বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্যপট। একসময় পিচঢালা পথ শেষ হয়, শুরু হয় পাহাড়ি পথ। সামনে সবুজে মোড়া উঁচু-নিচু টিলা, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনার স্বচ্ছ জল আর তার বুকে জেগে থাকা বালুচর। প্রকৃতির এমন নৈসর্গিক আয়োজনের মাঝেই গারো পাহাড়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম হারিয়াকোনা।
হারিয়াকোনায় পা রাখলেই মনে হয়, ব্যস্ত পৃথিবীটা যেন অনেক দূরে পড়ে আছে। ঝরনার দুই পাশে সবুজ বৃক্ষের আচ্ছাদন, কোথাও উঁচু টিলা, কোথাও পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট ঘর। টিলার কোল ঘেঁষে সাজানো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতিগুলো পুরো দৃশ্যপটে যোগ করেছে ভিন্ন এক সৌন্দর্য।
গ্রামটির প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বসবাস যেন বহু পুরোনো এক সম্পর্কের গল্প। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা মূলত কৃষিনির্ভর। পাহাড়, বন আর মাটির সঙ্গে প্রতিদিনের মেলবন্ধন তাদের জীবনযাত্রায় স্পষ্ট। ঘরবাড়িগুলো বেশির ভাগই পাহাড়ি টিলার ওপর। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের বুকের ওপর ছোট ছোট কুটির যেন আকাশ ছুঁতে চায়।
শ্রীবরদী শহর থেকে হারিয়াকোনার দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক। এরপর শুরু হয় কাঁচা পথ। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার কাঁচা সড়কের মধ্যে আড়াই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ, যেখানে যানবাহন চলাচলের সুযোগ নেই। পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিতে হয় সেই পথ।
এই দুর্গম পথই যেন হারিয়াকোনার সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত একটি কথা রয়েছে—গ্রামটিতে কেউ একবার যে পথে এসেছে, সে পথে আর ফিরে যেতে পারেনি। সেই থেকেই নাকি গ্রামের নাম হয়েছে ‘হারিয়াকোনা’। নামের সঙ্গে মিশে থাকা এই লোককথা জায়গাটির রহস্যময়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রায় আড়াই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এই গ্রামে রয়েছে প্রায় অর্ধশত টিলাভূমি। এসব টিলার ওপর গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি। এখানে বসবাস করে প্রায় ১৫০টি আদিবাসী পরিবার। তাদের মধ্যে গারো, কোচ ও হাজং জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন। বেশির ভাগই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী।
গ্রামের মাঝখানে রয়েছে একটি গির্জা। আছে জিবিসি পরিচালিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুটবল খেলার মাঠ, কয়েকটি মুদি দোকান ও চায়ের দোকান। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর তুলনায় রবিবার হারিয়াকোনার পরিবেশ কিছুটা আলাদা হয়ে ওঠে। এদিন গ্রামবাসীরা গির্জায় একত্রিত হন। উপাসনা ও ধর্মীয় কার্যক্রম শেষে চলে নানা আলোচনা ও আড্ডা। পুরো গ্রাম যেন হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা।
হারিয়াকোনার উত্তর ও পূর্ব দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পোড়াকাশিয়া এলাকা। দুই দেশের সীমান্ত চিহ্নিত হয়েছে ১০৯৩ ও ১০৯৪ নম্বর সীমান্ত পিলার দিয়ে। পশ্চিমে দিঘলাকোনা এবং দক্ষিণে বাবেলাকোনা।
গ্রামের ভেতরের পথটিও যেন প্রকৃতির নিজ হাতে সাজানো। পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সড়কের দুই পাশে গাছপালা, লতাপাতা ও সবুজের আবরণ। কোথাও সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পৌঁছায়, আবার কোথাও গাছের পাতার ফাঁক গলে আলো-ছায়ার খেলা তৈরি হয়।
তবে এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি হারিয়াকোনার মানুষের জীবনে রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। ভারত থেকে নেমে আসা বন্য হাতির তাণ্ডবে প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের ঘরবাড়ি ও কৃষিকাজ। প্রকৃতির খুব কাছাকাছি বসবাসের কারণে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপও তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
তারপরও হারিয়াকোনা নিজের মতো করেই বেঁচে আছে। আধুনিকতার স্পর্শ এখানে এখনও সীমিত। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঝরনার জল, সবুজ অরণ্য আর টিলার ওপর মানুষের বসতি—সব মিলিয়ে গ্রামটি যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।
গ্রামে প্রবেশের মুহূর্তেই মনে হয়, প্রকৃতি যেন ভ্রমণপিপাসু মানুষকে নীরব অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে যেতে চাইলে হারিয়াকোনা হতে পারে সেই হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা—যেখানে পাহাড়ের নীরবতা, ঝরনার শব্দ আর মানুষের সরল জীবন একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে অনন্য এক সৌন্দর্যের গল্প।