প্রকাশকাল: ১২ আগস্ট ২০২৬
ডাউনলোড: ১২ আগস্ট ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
QR Code
বিস্তারিত অনলাইনে পড়ুন
pagethenews.com /pagethenews

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সাহিত্য ডেস্ক

কবি, গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী মতিউর রহমান মল্লিকের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১০ সালের ১২ আগস্ট রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি বাংলা সাহিত্য ও ইসলামী সংগীতাঙ্গনে রেখে যান সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র এক সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার।

মতিউর রহমান মল্লিক ১৯৫০ সালের ১ মার্চ বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুন্সি কায়েম উদ্দিন মল্লিক স্থানীয় জারিগানের দলের জন্য গান লিখতেন। মা ছিলেন আয়েশা বেগম। পারিবারিক পরিবেশেই মল্লিকের সংগীত ও সাহিত্যচর্চার সূচনা হয়।

শৈশবে রেডিওতে গান শুনে গান লেখা শুরু করেন তিনি। প্রাথমিক জীবনে তার অধিকাংশ গান ছিল প্রেম ও প্রকৃতিনির্ভর। পরবর্তীতে ইসলামী আদর্শে প্রভাবিত হয়ে তিনি ইসলামী ভাবধারার গান ও কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করেন। তার সৃষ্টিকর্মে মানবতা, নৈতিকতা, বিশ্বাস, দেশপ্রেম ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

শিক্ষাজীবনে তিনি বারুইপাড়া সিদ্দীকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে বাগেরহাট পিসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনে মতিউর রহমান মল্লিক সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক, ‘বিপরীত উচ্চারণ’ সাহিত্য সংকলনের সম্পাদক এবং মাসিক কলম পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৮ সালে ঢাকায় সমমনা সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। পরবর্তীতে তার অনুপ্রেরণায় দেশের বিভিন্ন শহর, গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় একই ধারার অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যেও তার সাংস্কৃতিক চিন্তার প্রভাব বিস্তার করে।

সাহিত্য ও সংগীতচর্চায় তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। ব্যক্তিগত খ্যাতির চেয়ে আদর্শ ও মানুষের কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও অনুবাদ সাহিত্যে তিনি রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। ইসলামী ধারার গান ও কবিতা রচনার ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের পর তাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন। সাহিত্যাঙ্গনে তিনি ‘সবুজ জমিনের কবি’ ও ‘মানবতার কবি’ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘নিষণ্ন পাখির নীড়ে’, ‘সুর-শিহরণ’, ‘যত গান গেয়েছি’, ‘ঝংকার’, ‘আবর্তিত তৃণলতা’, ‘তোমার ভাষার তীক্ষ্ণ ছোরা’, ‘অনবরত বৃক্ষের গান’, ‘চিত্রল প্রজাপতি’ ও ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’।

অনুবাদক হিসেবেও মতিউর রহমান মল্লিকের পরিচিতি ছিল ব্যাপক। তার অনূদিত ‘পাহাড়ি এক লড়াকু’ কিশোর পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এছাড়া তিনি উপন্যাস অনুবাদের পাশাপাশি হজরত আলী ও আল্লামা ইকবালের মতো মুসলিম মনীষীদের কবিতাও অনুবাদ করেছেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে জাতীয় সাহিত্য পরিষদের স্বর্ণপদক, কলমসেনা সাহিত্য পুরস্কার, লক্ষ্মীপুর সাহিত্য সংসদ, রাঙামাটি সাহিত্য পরিষদ, খানজাহান আলী শিল্পীগোষ্ঠী, সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ এবং সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত সম্মাননা উল্লেখযোগ্য।

মতিউর রহমান মল্লিকের মৃত্যুর ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তার লেখা গান, কবিতা ও সাহিত্যকর্ম এখনো পাঠক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মাঝে সমাদৃত। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ তার সৃষ্টিকর্ম ও অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।