নিকলী উপজেলা প্রতিনিধি: হাওরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও ধান কাটার মৌসুমে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারিভাবে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিকলীসহ বিভিন্ন এলাকায় মোট ৫২টি হারভেস্টার মেশিন বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে শ্রমনির্ভর ধান কাটার ওপর চাপ কমিয়ে সময়মতো এবং কম খরচে ফসল ঘরে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। যান্ত্রিক ত্রুটি, দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার অভাবে এর মধ্যে অন্তত ১২টি হারভেস্টার মেশিন বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে সংকটকালীন এই সময়ে সরকারি এসব আধুনিক যন্ত্র কৃষকদের কোনো উপকারে আসছে না।
অন্যদিকে যেসব হারভেস্টার এখনো সচল রয়েছে, সেগুলোও হাওরের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক জমিতে প্রবেশ করতে পারছে না। গভীর পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে যন্ত্রচালিত কাটাই কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে আবারও পুরনো শ্রমনির্ভর পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছেন।
হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা জানান, বছরের অধিকাংশ সময়ই তারা বন্যা ও আকস্মিক পানি বৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করে ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু ধান কাটা মৌসুমে পানি দ্রুত বেড়ে গেলে পুরো বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এবারও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা।
তীব্র অনিশ্চয়তার মাঝেও কৃষকেরা যেটুকু ধান এখনো মাঠে টিকে আছে, তা দ্রুত কেটে ঘরে তোলার জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। অনেক এলাকায় কোমরপানি কিংবা বুকসমান পানির মধ্য দিয়ে নৌকা ব্যবহার করে ধান কেটে আনা হচ্ছে। কোথাও কোথাও পরিবারের সদস্যরাও একসঙ্গে মাঠে নেমে পড়েছেন ফসল রক্ষার জন্য।

স্থানীয় কৃষক কামাল মিয়া বলেন, “হাওরের ধান আমাদের সারা বছরের খোরাক। এই ধানই আমাদের জীবনের ভরসা। কিন্তু এখন নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না, শ্রমিকের দামও অনেক বেড়ে গেছে। যদি বৃষ্টি আর পানি না কমে, তাহলে আমাদের ফসল শেষ হয়ে যাবে। আমরা পথে বসে যাব।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি হারভেস্টার থাকলেও এখন কোনো কাজে আসছে না। যদি এগুলো ঠিকমতো চলত, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হতো।”
এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালাম বলেন, “হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধির কারণে হাওরের কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আমরা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করছি। যেসব জমিতে ধান প্রায় ৮০ শতাংশ বা তার বেশি পেকে গেছে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের অনুরোধ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, “কৃষকেরা দিন-রাত পরিশ্রম করে হাওর থেকে ধান তোলার চেষ্টা করছেন। তবে প্রতিদিনই বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি মূল্যায়নের কাজ চলমান রয়েছে।”
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দ্রুত মেরামত ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প সাপোর্ট সিস্টেম না থাকলে আধুনিক কৃষিযন্ত্রও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হাওরের কৃষকেরা একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনার চাপ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়ে গেছেন। ফলে চলতি মৌসুমে ধান উৎপাদন ও ঘরে তোলার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ রাইহান উদ্দিন এবং নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল কাইয়ুম মিয়াজী কর্তৃক গাজীপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। ইমেইলঃ pagethenews@gmail.com
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ “পেজ দ্যা নিউজ” কর্তৃপক্ষ দ্বারা সংরক্ষিত। © ২০২৫