রক্তস্নাত জুলাইয়ের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি: মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিতে মুখর রাজপথ, ফিরে দেখা সেই গণঅভ্যুত্থান
ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি (২য় বার্ষিকী) উপলক্ষে এ বছর জুলাই মাসজুড়ে দেশব্যাপী ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন যেভাবে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এক দফায় রূপ নিয়েছিল এবং ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, সেই ত্যাগ ও শহীদদের স্মৃতিকে স্মরণ করতেই প্রধান রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো মাঠপর্যায়ের নানামুখী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিগুলো আগামী ৫ আগস্ট ‘বিজয় দিবস’ উদযাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।
এবারের বর্ষপূর্তিতে দলগুলোর কর্মসূচির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুলাই গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিত করা, আহতদের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বার্তা। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক ৩৬ দিনব্যাপী বিশেষ রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। তাদের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দেশজুড়ে গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন, ‘জুলাই মেমোরিয়াল ফুটবল টুর্নামেন্ট’, এবং ১৭ জুলাই ফ্যাসিবাদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী ‘কাফনের কাপড় মিছিল’।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াত-ইসলামী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও ৩৬ দিনের পৃথক কর্মসূচি পালন করছে, যার মধ্যে রয়েছে জুলাইয়ের শহীদ ও আহত পরিবারের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদান, ১৬ জুলাই ঢাকার দুই মহানগরীতে বিশেষ আলোচনা সভা, ১ আগস্ট দেশব্যাপী ‘গণমিছিল’ এবং ৫ আগস্ট রাজধানীতে বিশাল সমাবেশ ও শোভাযাত্রা। এছাড়া বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ১৫ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আলোচনা সভা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোকচিত্র প্রদর্শনী, পথনাটক এবং ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
ফিরে তাকালে দেখা যায়, এই জুলাই মাসটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মাস। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট কর্তৃক সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের রায়ের পর ১ জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন”-এর ব্যানারে অহিংস আন্দোলন শুরু করে। তবে ১৫ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বর্বরোচিত হামলা এবং ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের পুলিশের গুলিতে বুক পেতে দিয়ে শহীদ হওয়ার ঘটনা পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়।
এরপর দেশজুড়ে ইন্টারনেট শাটডাউন, কারফিউ জারি এবং নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শত শত শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হলেও আন্দোলন দমানো যায়নি। সাধারণ নাগরিক, অভিভাবক ও মেহনতি মানুষ শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ালে আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অবশেষে ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ১ দফা দাবি ঘোষণা করা হয় এবং ৫ আগস্ট লাখ লাখ মানুষের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ বা ঢাকা অভিমুখে যাত্রার মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
এই জুলাই অভ্যুত্থানে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, এবারের ২য় বর্ষপূর্তির মূল সুরই হচ্ছে শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা এবং জুলাই সনদের আলোকে একটি বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার শপথ নেওয়া।