প্রকাশকাল: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ডাউনলোড: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
QR Code
বিস্তারিত অনলাইনে পড়ুন
pagethenews.com /pagethenews

ধর্মীয় সম্প্রীতি, তাওহিদ ও ইসলামের দৃষ্টিতে পূজা: এন. এইচ. এম. জোনায়েদ সিদ্দিকী

এন এইচ এম জোনায়েদ সিদ্দিকী

বাংলার প্রকৃতি যখন শরতের স্নিগ্ধতায় সেজে ওঠে, তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে সমাজের বিভিন্ন স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে চলে পূজার আয়োজন, মানুষের মধ্যে দেখা যায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়। এমন একটি সময়ে ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সহাবস্থান নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের আবাসভূমি। এখানে প্রত্যেক মানুষের ধর্মীয় পরিচয়, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করা জরুরি। তবে ধর্মীয় সম্প্রীতির অর্থ এই নয় যে, সব ধর্মের বিশ্বাস ও উপাসনাকে একই বলে স্বীকার করতে হবে। বরং বিশ্বাসের ভিন্নতা অক্ষুণ্ণ রেখেও পারস্পরিক অধিকার, মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই প্রকৃত সম্প্রীতি।

একজন মুসলিমের কাছে তাওহিদ ঈমানের মূল ভিত্তি। তাই শারদীয় দুর্গাপূজার মতো ধর্মীয় উপলক্ষ সামনে এলে একজন মুসলিমের জন্য যেমন নিজের আকিদা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও মানবিক আচরণ বজায় রাখাও অপরিহার্য।

ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহিদ:
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো তাওহিদ—আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা। একজন মুসলিমের ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের কেন্দ্রে রয়েছে এই অটল আকিদা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ۝ اللَّهُ الصَّمَدُ
অর্থ: “বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।” —সূরা আল-ইখলাস, ১১২:১–২

এই আয়াত ইসলামের একত্ববাদের সুস্পষ্ট ঘোষণা। একজন মুসলিমের কাছে প্রার্থনা, ইবাদত ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুতর পাপগুলোর একটি।

আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
অর্থ: “নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।” —সূরা লুকমান, ৩১:১৩

এখানে শিরকের গুরুতরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি, প্রতিমা কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর উপাসনায় অংশীদার করা তাওহিদের পরিপন্থী।

সুতরাং একজন মুসলিমের জন্য অন্য ধর্মের উপাসনাকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা, তাতে ইবাদত হিসেবে অংশগ্রহণ করা কিংবা শিরকী উপাসনাকে ধর্মীয়ভাবে সত্য বলে সমর্থন করা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এই আকিদাগত অবস্থান কাউকে অপমান করা, তার অধিকার হরণ করা কিংবা তার প্রতি অন্যায় আচরণ করার অনুমতিও দেয় না।

হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন থেকে তাওহিদের শিক্ষা:
তাওহিদের প্রশ্নে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তিনি তাঁর জাতির মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেছিলেন এবং মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

পবিত্র কোরআনে তাঁর পিতা ও জাতির উদ্দেশে বলা বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে—
إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا هَٰذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ
অর্থ: “যখন তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, ‘এই মূর্তিগুলো কী, যেগুলোর পূজায় তোমরা নিবিষ্ট হয়ে আছ?’” —সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৫২

এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর জাতিকে তাদের উপাসনার যৌক্তিকতা নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরবর্তী আয়াতগুলোতে দেখা যায়, তিনি তাঁর জাতিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, যেসব মূর্তি মানুষের উপাসনার বস্তু হয়ে উঠেছে, সেগুলো নিজেরাই মানুষের উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখে না।

পবিত্র কোরআনে তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ হলো—
قَالَ أَفَتَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكُمْ شَيْئًا وَلَا يَضُرُّكُمْ
অর্থ: “তিনি বললেন, ‘তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত করছ, যা তোমাদের কোনো উপকারও করতে পারে না এবং কোনো ক্ষতিও করতে পারে না?’” —সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৬৬

হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর এই বক্তব্য তাওহিদের মৌলিক যুক্তিকে সামনে আনে। ইবাদত ও উপাসনার প্রকৃত অধিকার একমাত্র আল্লাহর।

এখানে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ইসলামের আকিদা অনুসারে শিরকের বিরোধিতা করতে হবে জ্ঞান, যুক্তি, প্রজ্ঞা ও সুস্পষ্ট বিশ্বাসের ভিত্তিতে। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর তাওহিদের শিক্ষা গ্রহণ করার অর্থ তাঁর মতো এক আল্লাহর ইবাদতে অবিচল থাকা; পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ইসলামের ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার নির্দেশনাও অনুসরণ করা।

শিরক, পূজায় অংশগ্রহণ ও ধর্মীয় সমর্থনের প্রশ্ন:
শারদীয় দুর্গাপূজার সময় একজন মুসলিমের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রশ্ন আসে: অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশগ্রহণ, সেই উপাসনাকে সমর্থন এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার মধ্যে সীমারেখা কোথায়?

ইসলামের আকিদা অনুসারে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশ্যে ইবাদত করা শিরক। তাই পূজার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে উপাসক হিসেবে অংশ নেওয়া, প্রতিমার উদ্দেশ্যে প্রণাম বা উপাসনা করা কিংবা এসব কাজকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা একজন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়।

একইভাবে, কোনো শিরকী উপাসনাকে ধর্মীয়ভাবে সত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া বা সেটিকে নিজের ঈমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমর্থন করাও তাওহিদের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তবে এখানে একটি পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। কোনো পূজামণ্ডপ বা প্রতিমা অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখে পড়া, কোনো সংবাদে পূজার দৃশ্য দেখা কিংবা সামাজিক বাস্তবতার কারণে এ-সম্পর্কিত তথ্য জানা—এসবকে পূজায় অংশগ্রহণ বা শিরককে সমর্থন করার সমতুল্য বলা যায় না। কোনো ব্যক্তি কী উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন, কী কাজে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁর আচরণের প্রকৃতি কী—এসব বিষয় বিবেচনা না করে সব পরিস্থিতিকে একই বিধানের আওতায় আনা যথাযথ নয়।

অতএব, একজন মুসলিমের জন্য ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং নিজের আকিদা রক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে কেবল কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে অপমান করা, তার প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ করা কিংবা তার অধিকার ক্ষুণ্ন করাও ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষার পরিপন্থী।

আকিদার প্রশ্নে আপসহীনতা এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ন্যায়পরায়ণতা—ইসলামের এই দুই শিক্ষা একসঙ্গে ধারণ করতে হবে।

অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ইসলামের নির্দেশনা:
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
অর্থ: “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” —সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৬

এই আয়াত ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে জবরদস্তি না করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে। কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনে বাধ্য করা ইসলামের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

সূরা আল-কাফিরুনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
অর্থ: “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম।” —সূরা আল-কাফিরুন, ১০৯:৬

এই ঘোষণা ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্যকে স্পষ্ট করে। একজন মুসলিম নিজের বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকবেন; অন্যদিকে অন্য ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে তার প্রতি অন্যায় আচরণ করবেন না।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ
অর্থ: “যারা ধর্মের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।”

এই আয়াত আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক নির্দেশনা তুলে ধরে। ধর্মীয় পার্থক্য কাউকে অন্যায় করার অনুমতি দেয় না। বরং ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও মানুষের অধিকার রক্ষা একজন মুসলিমের চরিত্রের অপরিহার্য অংশ।

পূজা উপলক্ষে মুসলিমের করণীয়:
শারদীয় দুর্গাপূজার সময় একজন মুসলিমের জন্য নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
ইসলামের দৃষ্টিতে অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশগ্রহণ এবং প্রতিবেশী বা সহনাগরিকের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এক বিষয় নয়। একজন মুসলিম অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশ না নিয়েও অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করতে পারেন, বিপদে সহযোগিতা করতে পারেন, অসুস্থতার খোঁজ নিতে পারেন এবং সবার নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন।

পূজামণ্ডপে গিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, পূজার উদ্দেশ্যে প্রণাম করা কিংবা ধর্মীয় উপাসনার অংশ হিসেবে কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকা একজন মুসলিমের আকিদার দাবি। একই সঙ্গে পূজার সময় কোনো মণ্ডপে হামলা করা, প্রতিমা ভাঙচুর করা, মানুষের সম্পদ নষ্ট করা কিংবা কাউকে ভয়ভীতি দেখানোও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একজন মুসলিমের ধর্মীয় অবস্থান হবে সুস্পষ্ট: তিনি শিরককে সমর্থন করবেন না, অন্যের উপাসনাকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করবেন না; কিন্তু অন্যের জানমাল, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় ন্যায়সংগত ভূমিকা পালন করবেন। নিজের ধর্মের প্রতি আনুগত্য এবং অন্যের প্রতি ন্যায়বিচার—এ দুটি পরস্পরবিরোধী নয়।

সম্প্রীতি মানে বিশ্বাসের একীভূতকরণ নয়:
আমাদের সমাজে কখনো কখনো ধর্মীয় সম্প্রীতির অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কেউ মনে করেন, সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে। আবার কেউ ধর্মীয় পার্থক্যকে কেন্দ্র করে অন্যের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন। এই দুই প্রবণতার পরিবর্তে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

ইসলাম একজন মুসলিমকে নিজের আকিদা সম্পর্কে সচেতন থাকতে শেখায়; একই সঙ্গে ন্যায়বিচার, উত্তম আচরণ ও মানুষের অধিকার রক্ষার নির্দেশ দেয়।

সুতরাং ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বাসের পার্থক্য অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংযত ভাষা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইনের প্রতি সম্মান।

কেউ নিজের ধর্ম পালন করবেন, কেউ নিজের বিশ্বাস অনুসরণ করবেন—কিন্তু কেউ কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিপীড়ন, বৈষম্য কিংবা সহিংসতার শিকার হবেন না। একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি হওয়া উচিত এই নীতি।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান:
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বক্তব্য, ছবি ও মন্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য, উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে।

তাই তরুণদের উচিত ধর্মীয় বিষয়ে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জন করা, কোনো বক্তব্য প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা এবং উত্তেজনামূলক পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণ করা।

ইসলামের শিক্ষা প্রচার করতে হলে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও উত্তম উপস্থাপনার আশ্রয় নিতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
অর্থ: “আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।” —সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫

এই নির্দেশনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইসলামের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, সুন্দর ভাষা ও যথাযথ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা আর কোনো ধর্মাবলম্বী মানুষকে অপমান করা এক বিষয় নয়। শিরকের আকিদাগত বিরোধিতা করা ইসলামের অংশ; কিন্তু বিদ্বেষ ছড়ানো, গুজব প্রচার করা কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়া ইসলামের দাওয়াতের পদ্ধতি নয়।

শারদীয় দুর্গাপূজার এই সময়ে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক দায়িত্ব ও সামাজিক আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

একজন মুসলিম হিসেবে তাওহিদের ওপর অবিচল থাকা আমার ধর্মীয় দায়িত্ব। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়, আল্লাহর একত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা যায় না। শিরক থেকে বিরত থাকা, শিরকী উপাসনায় অংশগ্রহণ না করা এবং এমন উপাসনাকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে সমর্থন না করা একজন মুসলিমের আকিদার গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

অন্যদিকে, মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করাও আমার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য কাউকে অন্যায় করার অধিকার দেয় না।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় কাউকে অবমাননার কারণ হবে না, বিশ্বাসের ভিন্নতা সহিংসতার অজুহাত হবে না এবং ধর্মের নামে কেউ অন্যের অধিকার হরণ করবে না। ইসলামের বাণী আমাদের সামনে যে আদর্শ তুলে ধরে, তা হলো—আকিদায় আপসহীনতা, আচরণে ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের সঙ্গে লেনদেনে মানবিকতা।

তাওহিদ হবে আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি, ন্যায়বিচার হবে আমাদের আচরণের পরিচয় এবং উত্তম চরিত্র হবে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম।

ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে। আর ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ পাক একজন মুসলিমের জ্ঞান, চরিত্র, সততা ও উত্তম আচরণের মধ্য দিয়ে।

লেখক: এন এইচ এম জোনায়েদ সিদ্দিকী
শিক্ষার্থী, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা