মৃত্যুফাঁদে পরিণত বাসন্ডা বেইলি সেতু, পেরিয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার এক দশক!
বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৩৭ বছরের পুরোনো বেইলি সেতুটি এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই সেতু প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ ভারী যানবাহনসহ শত শত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের চাপ বহন করছে। গাড়ি উঠলেই কেঁপে ওঠে পুরো সেতু, স্টিলের পাটাতনে বিকট শব্দ, কোথাও ফাটল, কোথাও আবার ঢিলা নাট-বল্টু—সব মিলিয়ে চরম আতঙ্কে চলাচল করছেন চালক ও যাত্রীরা।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৮৯ সালে নির্মিত প্রায় ৩৯৪ ফুট দীর্ঘ ও ২৫ ফুট প্রস্থের এই বেইলি সেতুটি বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা ও যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ এবং কৃষিপণ্য, মাছ, শিল্পপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনের জন্য এই সেতুর ওপরই নির্ভরশীল।
অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপে সেতুর স্টিলের পাটাতন বারবার ফেটে যাচ্ছে, ঢিলে হয়ে পড়ছে নাট-বল্টু। ফলে কিছুদিন পরপর ঝালাই, স্টিলের প্লেট পরিবর্তন ও নাট-বল্টু টাইট করে সাময়িকভাবে সচল রাখা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৬ সালে সওজ বিভাগ সেতুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও প্রায় এক দশক পার হলেও এখনো নতুন সেতু নির্মাণ শুরু হয়নি। এতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় সেতুটি ধসে পড়লে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। নিয়মিত সংস্কার করেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা-বরিশাল রুটের ট্রাকচালক মো. রুস্তম আলী বলেন, “প্রতিবারই লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সাময়িক সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বছরের পর বছর কাগজেই সীমাবদ্ধ।”
বাসচালক আব্দুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে এই সেতু পার হতে হয়। গাড়ি উঠলেই সেতু কাঁপতে থাকে। দুর্ঘটনার ভয় নিয়েই চলতে হয়। জোড়াতালির পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় না করে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ করা উচিত।”
স্থানীয় বাসিন্দা নাছির উদ্দীন বলেন, “ভারী যানবাহন চললেই পুরো সেতু দুলতে থাকে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা দ্রুত নতুন সেতু চাই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত এক দশকে নতুন সেতু নির্মাণের একাধিক আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তবে ২০২৬ সালে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। সওজ জানিয়েছে, নতুন স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি) সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রকল্পটি।
ঝালকাঠি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার শরীফ খান বলেন, “বাসন্ডা বেইলি সেতুর পরিবর্তে নতুন স্থায়ী সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ডিপিপি অনুমোদন পেলেই নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে জনমনে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় সম্প্রতি স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা মানববন্ধন করে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রায় ৩৭ বছরের পুরোনো বাসন্ডা বেইলি সেতু এখন শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের নিরাপত্তা ও যোগাযোগের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তাই বড় কোনো দুর্ঘটনার আগেই আধুনিক ও টেকসই নতুন সেতু নির্মাণকে সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
