সমাজ কি আসলেই আমাদের পক্ষে?
“সমাজ কি আসলেই আমাদের পক্ষে নাকি রবিদের পক্ষে?”— নিরুপায় চোখে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে প্রশ্নটি করলো তনু।
তন্ময় নিচু গলায় শুধু এটুকুই বলতে পারলো, “জানি না আপু, শালিসের দিন দেখা যাবে।”
তনু আর তন্ময়— দুই ভাইবোন। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর তনুই ছোট ভাইটিকে নিজের মায়ের স্নেহ ও মমতায় আগলে বড় করেছে। স্ত্রীর আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় শোকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তাদের বাবা রুবেল মিয়া। তার কেবল মনে হয়, তার কারণেই হয়তো স্ত্রী চিরতরে হারিয়ে গেছেন। সংসারের এমন এক ঝোড়ো পরিস্থিতিতে নিজের কাঁধে পুরো পরিবারের বিশাল দায়িত্ব তুলে নেয় তনু।
তখন তার বয়স সবেমাত্র উনিশ। আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো তনুর চোখেও একজোড়া ধূসর স্বপ্ন ছিল— সে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে ঘরে খাবার থাকে না, সেখানে স্বপ্নের পেছনে ছোটা বিলাসিতা। নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে তনু সংসারের হাল ধরেছিল।
সেদিন ছিল পহেলা এপ্রিল। রাতের ঘড়িতে কাঁটা সাড়ে বারোটা ছুঁইছুঁই। প্রতিদিন রাত দশটার মধ্যে তনু বাড়ি ফিরলেও সেদিন তার কোনো দেখা নেই। চিন্তায় অস্থির হয়ে তন্ময় বোনকে বারবার ফোন করে, কিন্তু ওপাশ থেকে রিং হয়ে কেটে যায়। আর সহ্য করতে না পেরে হন্তদন্ত হয়ে ফোন করে তনুর সহকর্মী বৃষ্টিকে।
ফোন ধরতেই তন্ময় ব্যাকুল হয়ে জানতে চায় আপুর কথা। বৃষ্টি জানায়, অফিস তো যথারীতি ১০টাতেই ছুটি হয়েছে! বৃষ্টি আরও জানায়, আজকে তন্ময়ের জন্মদিন বলেই তনু তাড়াতাড়ি বের হয়েছিল। বৃষ্টি তন্ময়কে সান্ত্বনা দিয়ে বলে অফিসের দিকে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে।
বাইরে তখন আমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফাঁকা মহাসড়কে মেহগনি গাছের পাতার মর্মর শব্দ আর দূরের গাড়ির আনাগোনার ঝাপসা আওয়াজ। মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় ধরে এগোতে থাকে তন্ময়। হঠাৎ আলোর রিফ্লেকশনে মাটিতে চকচক করে ওঠে একজোড়া কানের রিং। তন্ময় স্তব্ধ হয়ে যায়। রিংটি হাতে নিয়েই তার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে— এটি তো তনু আপুর রিং! যেটি হারিয়ে যাওয়ার পর তন্ময়ই খুঁজে দিয়েছিল আর তনু খুশি হয়ে তার প্রিয় পায়েশ রান্না করে খাইয়েছিল।
একটু এগোতেই দেখতে পায় তনুর পরিচিত একজোড়া স্যান্ডেল আর কিছুদূর পর রক্তের ছোপছোপ দাগ লাগা ছেঁড়া ওড়না! চরম এক দীর্ঘস্থায়ী অজানা আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে যায় ষোলো বছরের তরুণ তন্ময়ের চারপাশ।
ঠিক তখনই রাস্তার পাশে নিচু পুকুরপাড় থেকে ভেসে আসে এক ক্ষীয়মাণ গোঙানির শব্দ। সিক্সথ সেন্স আর তীব্র ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে পুকুরপাড়ের দিকে নেমে যায় তন্ময়। মোবাইলের আবছা আলোয় দেখতে পায় রক্তাক্ত, অর্ধনগ্ন এক নিথর নারীদেহ। কাছে গিয়ে ফ্লাশটা মুখের ওপর ধরতেই স্তব্ধ হয়ে যায় তন্ময়— এ যে তার তনু আপু!
কয়েকজন নরপশু খুব নির্মমভাবে ছিন্নভিন্ন করে রেখে গেছে তাকে। নিজের পরনের শার্ট খুলে তন্ময় বোনের শরীর ঢেকে দেয়। বোনের মাথা কোলে নিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে, “তোর কিছু হবে না আপু, তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাব… যারা তোর এই অবস্থা করেছে আমি তাদের বাঁচতে দেব না!”
বাড়ি ফিরে আসার পর তনু পুরো ঘটনা খুলে বলে। স্থানীয় চেয়ারম্যানের ছেলে নিশান আর তার সঙ্গী রবি দীর্ঘদিন ধরে তনুকে উত্যক্ত করত। নালিশ করেও কোনো লাভ হয়নি, বরং সেদিন রাতে একা পেয়ে তারা এই পাশবিক অত্যাচার চালায়।
পরদিন সকালে বিচার চাইতে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি রাগিব আঙ্কেলের দ্বারে গিয়েও মেলে হতাশা। তিনি থানায় না গিয়ে গ্রামে শালিস বসানোর পরামর্শ দেন।
খবরটি জানাজানি হতেই শুরু হয় লোকলজ্জা আর প্রতিবেশীদের কুৎসিত গুঞ্জন। পাড়ার দু-একজন মহিলা আড়ালে-আবডালে ফিসফিস করে বলতে থাকে, “মেয়েমানুষের নিজের চরিত্র ভালো না হলে কি এত রাতে কাজ করে? নিশ্চয়ই টাকার ঝামেলা!”
অন্যদিকে অফিসে গেলেও মিলত সহকর্মীদের লোলুপ দৃষ্টি। এমনকি অফিসের বসও কুটিল প্রস্তাব দিলে তনু মুখে ঘৃণা ছুড়ে দিয়ে চাকরিটা ছেড়ে দেয়।
ঘটনার ১০ দিন পর চেয়ারম্যান বাড়িতে বসে বহু প্রতীক্ষিত শালিস। তনুর পক্ষে রাগিব আংকেল কথা বলতে গেলে সমাজের তথাকথিত মুরুব্বিরা তনুর চরিত্র আর রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়েই আঙুল তোলে।
সব শুনে চেয়ারম্যান রায় দেন, “মেয়েটার চরিত্র যদিও ভালো না, তাও আমার ছেলে নিশান আর শমসেরের ছেলে ভুলবশত একটা ভুল করে ফেলেছে। এখন তো আর হারানো সম্পদ ফেরত পাওয়া যাবে না! তাই দুইজনে ১০ হাজার করে মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা দিক, ঝামেলা মিটে যাক।”
এক অন্যায় ও অদ্ভুত রায়ে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো প্রাঙ্গণ। তন্ময় কান্নাভেজা কণ্ঠে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, “আপনাদেরও তো মেয়ে-বোন আছে! তাদের সাথে এমন হলে ২০ হাজার টাকায় মিটিয়ে দিতেন? আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম, আমাদের জরিমানা লাগবে না!”
সেখান থেকে একবুক ক্ষোভ নিয়ে থানায় গেলেও পুলিশ তাদের মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরাজিত হয়ে বাড়ি ফেরার পথে তনু তন্ময়কে সেই আকুল প্রশ্নটি করেছিল, “সমাজ কি আসলেই আমাদের পক্ষে নাকি রবিদের পক্ষে?”
তন্ময় উত্তর দিয়েছিল, “কখনো আমাদের পক্ষে ছিল না আপু, কখনোই না।”
সে রাতে তন্ময়কে ঘরে গিয়ে ঘুমাতে বলে তনু। মুচকি হেসে বলে, সে আর কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেবে না। কিন্তু পরদিন সকালে হাজার ডাকার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মেলে না।
দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতেই তন্ময়ের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। ঘরের সিলিংয়ে ঝুলছে তনুর নিথর দেহ। পাশে পড়ে আছে একটি ছোট্ট চিরকুট—
“প্রিয় তন্ময়,
ভালো থাকিস ভাই আমার, বাবার খেয়াল রাখিস। আমাকে মাফ করে দিস, তোকে রেখে একা চলে গেলাম। আমি নিরুপায় ভাই! এই সুশীল সমাজে কখনো বিচার পাব না। কলঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে আমি অধিক শ্রেয় মনে করলাম। ভালো থাকিস…
ইতি,
তনু”
