অনুপস্থিতিরও এক দীর্ঘ ব্যাকরণ; একটি সাহিত্যিক গদ্য
মানুষের জীবনে কিছু সন্ধ্যা আসে, যাদের কোনো নির্দিষ্ট নাম থাকে না। তারা দিনের মতো শেষ হয় না, রাতের মতো শুরু হয় না—শুধু নিঃশব্দে মানুষের ভেতরে একটি দীর্ঘ ছায়া রেখে যায়। সেইসব সন্ধ্যায় পুরোনো কথাগুলো হঠাৎ খুব কাছে এসে বসে; একসময় উচ্চারিত প্রতিশ্রুতিগুলো মনে হয় দূর কোনো ঋতুতে ঝরে পড়া পাতার শব্দ।
কত কিছুই তো দেখা হয় জীবনে!
মানুষের মুখে ঋতু বদলাতে দেখা যায়। যে চোখ একদিন ফিরে আসার নিশ্চয়তা বহন করত, সেখানেই একদিন অচেনা দূরত্বের কুয়াশা জমে। যে কণ্ঠ একসময় অনুপস্থিতির হিসাব রাখত, সময়ের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই কণ্ঠই উপস্থিতির প্রয়োজনটুকু ভুলে যায়। আর যে প্রতিশ্রুতিগুলো একদিন ভবিষ্যতের মতো শোনাত, সেগুলোর শরীরেও একসময় পচন ধরে—শব্দগুলো বেঁচে থাকে, অথচ তাদের ভেতরের অর্থটি ধীরে ধীরে মৃত হয়ে যায়।
তবু সবকিছুর উত্তর দিতে নেই।
কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলে প্রশ্নটিই ছোট হয়ে যায়। কিছু আচরণের ব্যাখ্যা চাইতে গেলে নিজের মর্যাদার কাছেই ঋণী হয়ে পড়তে হয়। তাই কোনো কোনো দৃশ্যের সামনে নীরবতাই সবচেয়ে সুদীর্ঘ বাক্য হয়ে থাকে। সময়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া কিছু সত্য মানুষের মুখে উচ্চারিত সত্যের চেয়েও অধিক নির্মম এবং অধিক নির্ভুল।
সময় কাউকে অভিযুক্ত করে না; শুধু একদিন প্রমাণ করে দেয়।
মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। হারানোর পূর্বক্ষণে সে মুঠো শক্ত করতে জানে, অথচ থাকার মুহূর্তে তার আঙুলগুলো কেন যেন শিথিল হয়ে আসে। প্রাপ্তির উষ্ণতা তাকে অভ্যস্ত করে তোলে, আর অনুপস্থিতির শীত তাকে হঠাৎ সচেতন করে দেয়—কী ছিল, কতটা ছিল এবং কখন থেকে আর ছিল না।
সম্ভবত মানুষ প্রাপ্তির মূল্য বোঝে না; সে কেবল হারানোর শব্দ শুনলেই তার প্রতিধ্বনি চিনতে শেখে।
কিছু মানুষ সম্পর্কের দরজায় এসে দীর্ঘকাল দাঁড়িয়ে থাকে। তারা ভেতরে প্রবেশ করে না, আবার ফিরে যাওয়ার সাহসও রাখে না। তাদের অবস্থান এক অদ্ভুত অন্তর্বর্তী ভূগোল—যেখানে নৈকট্য আছে, অথচ নিশ্চয়তা নেই; পরিচয় আছে, অথচ অধিকার নেই; স্পর্শ আছে, অথচ আশ্রয় নেই।
তাদের উপস্থিতি একপ্রকার দীর্ঘ অনুপস্থিতি।
তারা পাশে থাকে, কিন্তু পাশে থাকার অর্থ বহন করে না। তাদের কথায় আন্তরিকতার আবরণ থাকে, অথচ সেই আবরণের নিচে কোথাও এক অদৃশ্য বিদায়ের প্রস্তুতি চলতে থাকে। তাদের হাসির মধ্যে উষ্ণতা থাকে, কিন্তু সেই উষ্ণতার শেষ প্রান্তে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় শীতল কোনো দেয়াল।
সবচেয়ে নির্মম প্রতারণা বোধহয় মিথ্যা বলা নয়।
মিথ্যা একদিন ধরা পড়ে।
কিন্তু কাউকে এমন একটি আশ্বাসের ছায়ায় রেখে দেওয়া—যার নিচে কোনোদিনই আশ্রয় ছিল না—তার চেয়ে দীর্ঘ প্রতারণা আর কী হতে পারে?
কিছু হাত হাত ধরে না; শুধু পতনের মুহূর্তে পড়ে যেতে দেয় না। সেই হাতের কোনো প্রতিশ্রুতি থাকে না, কোনো দীর্ঘ ভবিষ্যতের ভাষাও থাকে না—তবু বিপদের সময়ে তার দৃঢ়তা মানুষকে বাঁচিয়ে দেয়।
আবার কিছু হাত এমনভাবে হাত ধরে, যেন পৃথিবীর সমস্ত অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে তারা একটি ক্ষুদ্র অথচ অটল দুর্গ। তারপর সময় একটু বদলায়। জীবন তার স্বাভাবিক নির্মমতা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। আর সেই হাতের আঙুলগুলো একে একে আলগা হয়ে যায়।
তখন মানুষ বুঝতে পারে—সব দৃঢ় স্পর্শ আশ্রয় নয়। কিছু স্পর্শ কেবল বিদায়ের আগে দেওয়া উষ্ণতা।
ভালোবাসারও বোধহয় একধরনের নিষ্ঠুর ব্যাকরণ আছে।
সেখানে ‘থাকব’ শব্দটি সবসময় থাকার অর্থ বহন করে না। ‘আমি আছি’ বাক্যটির ভেতরেও কখনো কখনো অনুপস্থিতির দীর্ঘ ছায়া লুকিয়ে থাকে। ‘চিরকাল’ শব্দটি কখনো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়; কখনো তা কেবল একটি মুহূর্তের আবেগ, যা সময়ের প্রথম পরীক্ষাতেই তার অর্থ হারিয়ে ফেলে।
মানুষ কখনো কখনো কাউকে ভালোবাসে না—শুধু তার চলে যাওয়াটাকে মেনে নিতে পারে না।
তাই আঁকড়ে রাখে।
ভালোবাসার জন্য নয়, নিজের ভেতরের শূন্যতার ভয় থেকে।
কারণ কিছু মানুষকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়; তার সঙ্গে হারিয়ে যায় নিজের অভ্যাস, অপেক্ষা, প্রতিদিনের কিছু অকারণ আনন্দ, কিছু নির্দিষ্ট শব্দ, কিছু পরিচিত নীরবতা। মানুষ তখন ব্যক্তিটিকে নয়, নিজের জীবনের একটি অংশকে আঁকড়ে ধরে রাখে।
আবার যে মানুষটি চলে যেতে চায়, সেও সবসময় সম্পূর্ণ নির্মম নয়। তার ভেতরেও হয়তো যুদ্ধ থাকে।
একদিকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ফিরে আসার সংশয়। একদিকে সম্পর্কের ভার, অন্যদিকে স্মৃতির টান। সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়, আবার পেছনে তাকায়। ফিরে আসতে চায়, অথচ আগের জায়গায় আর ফিরতে পারে না।
এই দুই বিপরীত আকাঙ্ক্ষার মাঝখানেই জন্ম নেয় কিছু অসমাপ্ত সম্পর্ক।
তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক মৃত্যু নেই, অথচ তারা আর জীবিতও নয়।
তারা মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে—একটি অসমাপ্ত বাক্যের মতো, যার শেষ শব্দটি কেউ আর উচ্চারণ করে না।
জীবন অবশ্য কোনো অসমাপ্ত বাক্যের জন্য থেমে থাকে না।
নদী তার মৃত স্রোত বয়ে নিয়ে যায়। গাছ নির্দ্বিধায় ঝরিয়ে দেয় পুরোনো পাতা। শীতের শেষে নতুন কুঁড়ি আসে। সন্ধ্যা প্রতিদিন নিঃশব্দে দিনের সমস্ত আলো গিলে ফেলে।
প্রকৃতি জানে—শেষ মানেই সবকিছুর বিলুপ্তি নয়।
শুধু মানুষই কখনো কখনো একটি অর্ধেক স্পর্শকে সম্পূর্ণ ভালোবাসা ভেবে বহুদিনের অন্ধকারে বসে থাকে। সে অপেক্ষা করে—হয়তো একটি ফোনের জন্য, হয়তো একটি কথার জন্য, হয়তো সেই পুরোনো স্বরের জন্য, যে স্বর একসময় তার সমস্ত অনিশ্চয়তাকে শান্ত করে দিত।
কিন্তু অপেক্ষারও একসময় মৃত্যু হয়।
একদিন মানুষ আর অপেক্ষা করে না। কোনো অভিমান থেকে নয়; বরং সে বুঝে যায়—যার আসার কথা ছিল, সে হয়তো আসার পথেই নেই।
সেই দিনটিই হয়তো প্রকৃত বিচ্ছেদের দিন।
মানুষ চলে যাওয়ার দিন নয়; যেদিন তার জন্য অপেক্ষা করাটাও অর্থহীন হয়ে যায়, সেদিন।
শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতির চেয়ে উপস্থিতিই সত্য। শব্দের চেয়ে স্পর্শ। আর স্পর্শের চেয়েও সত্য সেই কঠিন সময়—যখন পৃথিবী বিপরীত দিকে দাঁড়ায়, তখন কে সত্যিই হাতটি শক্ত করে ধরে রাখে।
কারণ সুখের সময়ে পাশে থাকা খুব কঠিন কোনো শিল্প নয়। মানুষ আনন্দের ভিড়ে সহজেই আপন হয়ে ওঠে। প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় দুর্দিনের নিঃসঙ্গ করিডোরে—যেখানে আলো কম, পথ দীর্ঘ এবং ফিরে যাওয়ার রাস্তা প্রায় অদৃশ্য।
সেখানে যে হাতটি ছাড়ে না, সেই হাতই আশ্রয়।
বাকিটা ইতিহাস নয়—অভ্যাস।
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতারণাগুলো মিথ্যা কথায় তৈরি হয় না। তারা তৈরি হয় অর্ধেক-সত্যে। সেইসব বাক্যে, যেখানে কেউ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও থেকে যাওয়ার অভিনয় করে; সেইসব স্পর্শে, যেখানে বিদায়ের প্রস্তুতি লুকিয়ে থাকে অথচ ভালোবাসার ভাষা উচ্চারিত হয়; সেইসব চোখে, যেখানে আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই অথচ মানুষটিকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো হয়।
কী আশ্চর্য এই জীবন!
কেউ কেউ সারাজীবন পাশে থাকার ভাষা শেখে, অথচ একদিন পাশে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের ছায়াটুকুও আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবু সময় কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র লেখে না।
সে শুধু অপেক্ষা করে।
তারপর একদিন, যখন সমস্ত আবেগের কুয়াশা সরে যায়, তখন তার নির্মম আলোয় একে একে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সবকিছু—কোন হাত ছিল আশ্রয়, কোন হাত ছিল অভ্যাস, কোন প্রতিশ্রুতি ছিল সত্য, কোন নৈকট্য ছিল নিঃসঙ্গতার সাময়িক চিকিৎসা আর কোন স্পর্শ ছিল আসন্ন বিচ্ছেদের আগে দেওয়া একটি উষ্ণ মিথ্যা।
সেদিন আর কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রয়োজন থাকে না।
কারণ কিছু সত্য এত দেরিতে প্রকাশিত হয় যে, প্রকাশের মুহূর্তে তার আর কোনো বিচার প্রয়োজন হয় না।
শুধু মনে হয়—কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে থাকার জন্য নয়; তারা আসে আমাদের কিছু সত্য শেখানোর জন্য। শেখায়, ভালোবাসা আর ভালোবাসার অভিনয়ের মধ্যে দূরত্ব কত গভীর। শেখায়, প্রতিশ্রুতি আর দায়িত্ব এক জিনিস নয়। শেখায়, কাছে থাকা আর পাশে থাকার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ পৃথিবীর ব্যবধান।
আর সবচেয়ে কঠিন সত্যটি মানুষ শেষেই শেখে—
বিচ্ছেদ মানুষ চলে যাওয়ার দিন থেকে শুরু হয় না। বিচ্ছেদ শুরু হয় অনেক আগে।
কোনো এক অদৃশ্য সন্ধ্যায়, যখন একজন মানুষ পাশে বসে থেকেও আর আগের মতো শোনে না; কথা বলে, অথচ কথার ভেতর আর কোনো প্রত্যাবর্তন থাকে না; হাত ধরে, অথচ মুঠোর ভেতর আর কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
মানুষ তখনও পাশে থাকে।
কথা বলে।
হাসে।
হয়তো ভালোবাসার শব্দও উচ্চারণ করে।
শুধু আর থাকে না।
আর সেই অনুপস্থিতির কোনো শব্দ নেই।
আছে কেবল একটি দীর্ঘ নীরবতা—যার অর্থ কোনো মানুষকে বুঝিয়ে বলতে হয় না।
সময় একদিন নিজেই তার অনুবাদ করে দেয়।
লেখক:
–এন এইচ এম জোনায়েদ সিদ্দিকী
