হারিকেনের আলো থেকে মোবাইলের স্ক্রিনে বদলে যাওয়া জীবন
গরুর গাড়ি থেকে স্মার্টফোন, হারিকেনের আলো থেকে মোবাইলের স্ক্রিন—সময় বদলেছে, বদলে গেছে গ্রামবাংলার জীবনও। কয়েক দশকের ব্যবধানে গ্রামের সেই চেনা চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। কাঁচা রাস্তার জায়গায় এসেছে পাকা রাস্তা, গরুর লাঙলের জায়গা নিয়েছে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার, হারিকেনের জায়গায় এসেছে বিদ্যুতের আলো। মানুষের হাতে এসেছে মোবাইল ফোন, তারপর স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট। জীবন হয়েছে অনেক সহজ, যোগাযোগ হয়েছে দ্রুত। কিন্তু এই সহজ জীবনের সঙ্গে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে আগের দিনের সেই স্বাভাবিকতা, আন্তরিকতা আর মানুষে মানুষে কাছে থাকার অভ্যাস।
একসময় গ্রামের সকাল শুরু হতো পাখির ডাক, মসজিদের আজান, গরুর ডাক কিংবা উঠানে ঝাড়ু দেওয়ার শব্দে। সূর্য ওঠার আগেই অনেকের ঘুম ভেঙে যেত। কৃষক গরু নিয়ে মাঠের পথে বের হতেন, কেউ গোয়াল পরিষ্কার করতেন, কেউ রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। বাড়ির উঠানে শিশুদের ছোটাছুটি, পুকুরঘাটে মানুষের আনাগোনা, পাশের বাড়ির মানুষের সঙ্গে দু-একটি কথা—সব মিলিয়ে দিনের শুরুতেই জীবনের একটা নিজস্ব ছন্দ ছিল।
জীবন তখন সহজ ছিল না। খেটে খাওয়া মানুষের পরিশ্রম ছিল বেশি। জমি চাষ করতে গরু লাগত, ধান কাটতে মানুষের শ্রম লাগত, ফসল ঘরে তুলতে পরিবারের সবাইকে কাজে নামতে হতো। অনেক কাজেই প্রতিবেশীর সহযোগিতা ছাড়া চলত না। কারও বাড়িতে ধান কাটার কাজ হলে পাশের বাড়ির মানুষও এগিয়ে আসতেন। কারও বাড়িতে বিয়ে হলে আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও কাজে যোগ দিতেন। কারও ঘর উঠলে কেউ বাঁশ দিতেন, কেউ শ্রম দিতেন, কেউ খাবার নিয়ে হাজির হতেন। সাহায্য তখন শুধু টাকা দিয়ে হতো না; মানুষের সময়, শ্রম আর আন্তরিকতাও ছিল বড় সম্পদ।
সেই সময় মানুষের প্রয়োজনও ছিল সীমিত। তাই হয়তো জীবনযাত্রায় কষ্ট ছিল, কিন্তু ব্যস্ততার ধরনটা ছিল অন্যরকম। দিনের বড় একটা সময় মানুষ কাজ করত, আবার কাজের ফাঁকে কথা বলত, গল্প করত, হাসত। বিকেল হলে কেউ গরু নিয়ে বাড়ি ফিরতেন, কেউ পুকুরে গোসল করতেন, কেউ চায়ের দোকানে বসতেন। গ্রামের বড় গাছের নিচে কিংবা বাড়ির উঠানে বসত আড্ডা। শিশুরা মাঠে খেলত, কিশোরেরা নানা খেলাধুলায় মেতে থাকত। মানুষের বিনোদনের জন্য আলাদা কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন ছিল না। মানুষই ছিল মানুষের বিনোদন।
বাড়ির উঠান ছিল যেন একটি পরিবারের প্রাণ। একই উঠানে দাদা-দাদি, বাবা-মা, চাচা-চাচি, ভাই-বোনসহ একাধিক প্রজন্মের মানুষ বসত। সন্ধ্যার পর সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করত। বয়োজ্যেষ্ঠরা পুরোনো দিনের কথা বলতেন, শিশুরা মন দিয়ে শুনত। দাদা-দাদির মুখে শোনা গল্পের মধ্য দিয়েই অনেক শিশু গ্রামের ইতিহাস, পরিবারের কথা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কিংবা রূপকথার সঙ্গে পরিচিত হতো। কোনো বাড়িতে রেডিও থাকলে সেটিকে ঘিরেও বসত পরিবারের সবাই। খবর, গান, নাটক কিংবা খেলাধুলার অনুষ্ঠান শুনতে রেডিও ছিল বড় আকর্ষণ।

হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা, মাটির চুলায় রান্না, পুকুর থেকে পানি আনা, গরু-ছাগল পালন, ধান মাড়াই, উঠানে ধান শুকানো—এসব ছিল গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্য। গ্রামের নারীদের জীবনও ছিল কঠোর পরিশ্রমে ভরা। রান্না, পানি সংগ্রহ, ঘর পরিষ্কার, শিশুদের দেখাশোনা, গবাদিপশুর যত্ন, ধান পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে কৃষিকাজের নানা কাজে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল। কষ্ট ছিল অনেক, কিন্তু সেই জীবনযাত্রার মধ্যে পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে একটা গভীর যোগাযোগ ছিল।
গ্রামের হাটও ছিল শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়। হাটবারে কৃষক ফসল নিয়ে আসতেন, ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে বসতেন, মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেন। কিন্তু কেনাবেচার বাইরেও সেখানে দেখা হতো পরিচিত মানুষের সঙ্গে। চায়ের দোকানে বসে বাজারদর থেকে শুরু করে গ্রামের নানা খবর নিয়ে আলোচনা চলত। কেউ দূর গ্রাম থেকে এলে পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হতো। অনেক সময় হাটই ছিল মানুষের খবর নেওয়া ও খবর দেওয়ার বড় মাধ্যম।
পুকুরঘাটের চিত্রও ছিল একই রকম। গোসল, কাপড় ধোয়া কিংবা পানি সংগ্রহের পাশাপাশি সেখানে মানুষের দেখা হতো, কথা হতো, গ্রামের খবর আদান-প্রদান হতো। এখন অনেক জায়গায় পানির ব্যবস্থা সহজ হয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, কেনাকাটা হয়েছে আধুনিক। ফলে এসব জায়গার সামাজিক ভূমিকা আগের মতো নেই।
প্রযুক্তি অবশ্য গ্রামীণ জীবনকে অনেক কিছু দিয়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে, রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। আগে যে কাজে কয়েকজন মানুষের পুরো দিন লেগে যেত, এখন অনেক সময় যন্ত্র দিয়ে অল্প সময়েই তা করা সম্ভব। মোবাইল ফোনের কারণে দূরে থাকা স্বজনের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়। বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা যায়। কৃষক মোবাইলের মাধ্যমে আবহাওয়া, বাজারদর ও কৃষিসংক্রান্ত তথ্য জানতে পারেন। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে অনলাইনে পড়াশোনা করতে পারে। ব্যবসা, ব্যাংকিং ও নানা সেবাও এখন হাতের মুঠোয়।
অর্থাৎ প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সহজ জীবন আমাদের কাছ থেকে কী কেড়ে নিচ্ছে?
আজ একই ঘরে বসে পরিবারের চার-পাঁচজন মানুষ থাকলেও প্রত্যেকের হাতে থাকতে পারে আলাদা একটি মোবাইল ফোন। কেউ ফেসবুক দেখছেন, কেউ ইউটিউব, কেউ টিকটক বা অন্য কোনো কনটেন্ট দেখছেন, কেউ গেম খেলছেন। পাশের মানুষটি কী বলছে, তার চেয়ে অনেক সময় ফোনের পর্দায় কী ঘটছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগে সন্ধ্যায় বলা হতো, ‘চলো, একটু বসি, কথা বলি।’ এখন অনেক সময় বলা হয়, ‘একটু দাঁড়াও, ফোনটা দেখি।’
শিশুদের জীবনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে বিকেল মানেই মাঠ, বন্ধু আর খেলাধুলা। এখন অনেক শিশুর অবসরের বড় অংশ কেটে যায় মোবাইলের স্ক্রিনে। প্রযুক্তির মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সারাক্ষণ স্ক্রিনে থাকার কারণে মাঠে দৌড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে মেশা কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে অনেকের।
শুধু শিশুরাই নয়, বড়রাও মোবাইলের বাইরে নেই। কৃষক থেকে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী থেকে চাকরিজীবী—প্রায় সব বয়সের মানুষই এখন স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরশীল। কাজের প্রয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, গেম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্টে অনেক সময় ব্যয় হচ্ছে। রাত গভীর হলেও অনেক বাড়িতে মোবাইলের স্ক্রিন জ্বলতে থাকে। ঘুমানোর আগে ফোন দেখা, বিছানায় শুয়ে স্ক্রল করা কিংবা ঘুম ভেঙে ফোন হাতে নেওয়াও অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আগের দিনের মানুষ শারীরিকভাবে বেশি পরিশ্রম করতেন। মাঠে কাজ, হেঁটে যাতায়াত, গবাদিপশুর যত্ন, ঘরের নানা কাজ—দৈনন্দিন জীবনেই শারীরিক পরিশ্রমের একটা স্বাভাবিক জায়গা ছিল। এখন প্রযুক্তি অনেক কাজকে সহজ করে দিয়েছে। এতে সময় ও শ্রম বেঁচেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন শারীরিক চলাফেরা ও পরিশ্রমও অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, অনিয়মিত ঘুম ও কম শারীরিক কর্মকাণ্ডের কারণে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি শরীরচর্চা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনও জরুরি।
তবে পুরোনো দিনের জীবনকে পুরোপুরি ভালো আর বর্তমানকে পুরোপুরি খারাপ বলার সুযোগ নেই। আগের দিনে দারিদ্র্য ছিল, চিকিৎসার সুযোগ সীমিত ছিল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্বল, কৃষকের পরিশ্রম ছিল অনেক বেশি। অনেক পরিবারকে জীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই কঠিন সংগ্রাম করতে হতো। আজকের প্রযুক্তি সেই কষ্টের অনেকটাই কমিয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার সুযোগ বেড়েছে, তথ্য ও শিক্ষা সহজলভ্য হয়েছে, যোগাযোগ হয়েছে দ্রুত।
সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যাটি তৈরি হয় যখন প্রযুক্তি মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। মোবাইল আমাদের প্রয়োজন মেটানোর একটি মাধ্যম হওয়ার কথা, কিন্তু অনেক সময় আমরা নিজেরাই মোবাইলের অভ্যাসের কাছে আটকে যাচ্ছি। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় ফোন, খাওয়ার সময় ফোন, ঘুমানোর আগে ফোন—জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে স্ক্রিন ঢুকে পড়ছে।
তাই হয়তো আমাদের পুরোনো দিনের সবকিছু ফিরিয়ে আনার দরকার নেই। গরুর গাড়ি, হারিকেন কিংবা সেই পুরোনো কৃষিজীবনও হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু সেই জীবনের কিছু ভালো দিক ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পরিবারের সবাই মিলে কিছু সময় কথা বলা যায়, খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা যায়, শিশুদের মাঠে খেলতে দেওয়া যায়, বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে বসে তাঁদের গল্প শোনা যায়। প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া যায়, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো যায়।
কারণ একসময় একটি বাড়ির উঠানে অনেক মানুষ বসত। সেখানে গল্প হতো, হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি হতো, শিশুরা খেলত। এখন সেই একই বাড়িতে সবাই থাকতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকের চোখ থাকতে পারে আলাদা একটি স্ক্রিনে।
সময় বদলেছে। গ্রাম বদলেছে। মানুষের জীবনও বদলেছে। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কিন্তু সেই সহজ জীবনের ভিড়ে যেন আমরা মানুষে মানুষে কথা বলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো এবং প্রকৃতির সঙ্গে থাকা—এই সাধারণ অথচ মূল্যবান বিষয়গুলো ভুলে না যাই।
গ্রামবাংলার সেই পুরোনো দিন হয়তো আর ফিরে আসবে না। উঠানে আগের মতো মানুষও হয়তো বসবে না। হারিকেনের আলোও হয়তো আর জ্বলবে না। কিন্তু সেই সময়ের মানবিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, পারিবারিক উষ্ণতা আর মানুষের প্রতি মানুষের টান—এসব তো হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়।
হারিকেনের আলো থেকে মোবাইলের স্ক্রিনে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের জীবন। এখন প্রয়োজন শুধু স্ক্রিনের আলো নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের আলোটুকুও জ্বালিয়ে রাখা।
লেখক: আবু ছাহিম
সাঁথিয়া, পাবনা
