রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার বর্বরোচিত মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ রবিবার (৭ জুন) বেলা ১১টার পর ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত জনাকীর্ণ এজলাসে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। একই সাথে আদালত আসামিদের অর্থদণ্ডেরও আদেশ দেন।
ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এই রায় আসায় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও নিহতের স্বজনদের মাঝে সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আজ সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে নারী আসামি স্বপ্না আক্তারকে কঠোর নিরাপত্তায় আদালতে আনা হয়। এর কিছুক্ষণ পর, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে প্রিজনভ্যানে করে কারাগার থেকে মূল আসামি সোহেল রানাকে নিয়ে আসা হয়।
রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত দুজনকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়েছিল। এরপর বেলা ১১টার দিকে তাদের এজলাসে তোলা হলে বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। মামলার এজাহার ও অভিযোগ সূত্র থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা আক্তার স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে ডেকে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে যায়।
সেখানে স্বপ্নার স্বামী সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং পরে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে। স্কুলে যাওয়ার সময় পেরিয়ে গেলেও রামিসাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তার বাবা-মা। একপর্যায়ে স্বপ্নার রুমের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পেয়ে তাদের সন্দেহ হয়। ডাকাডাকিতে সাড়াশব্দ না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই শিউরে ওঠেন সবাই।
শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকবিহীন দেহ, আর মাথাটি রাখা ছিল একটি বড় বালতির ভেতরে। ঘরের ভেতরেই দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় স্বপ্না আক্তারকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি নিজের স্বামীর অপরাধের কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, সোহেল রানা হীন কামনা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমে আটকে ধর্ষণ ও পরে গলা কেটে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় ১৯ মে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার দিনই পুলিশ নারায়ণগঞ্জ থেকে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং মিরপুরের বাসা থেকে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২০ মে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় সোহেল রানা। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মাত্র ৫ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৪ মে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। ১ জুন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে।
অবশেষে আজ ৭ জুন, ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আদালত এই রায় ঘোষণা করলেন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল এবং দ্রুত বিচারের দাবি জানানো হয়েছিল। মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আদালতের এই রায়কে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ও দৃষ্টান্তমূলক অধ্যায় হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
