জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমল ও কোরবানির আগে চুল-নখ না কাটার বিধান
জিলহজ ইসলামের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতময় মাস। এই মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য নিয়ে আসে পবিত্র হজ, কোরবানি ও ত্যাগের অনন্য শিক্ষা।
বিশেষ করে জিলহজের প্রথম ১০ দিনকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সুরা ফজরে এই ১০ রাতের শপথ করেছেন, যা এর বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্বের স্পষ্ট প্রমাণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জিলহজের প্রথম ১০ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে বছরের অন্য যেকোনো দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।” সহীহ বুখারী অনুযায়ী বর্ণিত এই হাদিস মুসলমানদের জন্য এ সময়কে ইবাদত, জিকির ও আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে তুলে ধরে।
এই বরকতময় দিনগুলোতে তওবা-ইস্তিগফার করা, বেশি বেশি নফল নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং দান-সদকার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষভাবে ৯ জিলহজ আরাফার দিনের রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। পাশাপাশি তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ এবং তাকবিরে তাশরিক আদায় করাও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
জিলহজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কোরবানি। আর কোরবানিকে ঘিরে শরিয়তে কিছু বিশেষ নির্দেশনাও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—যে ব্যক্তি কোরবানি দেওয়ার নিয়ত করবেন, তিনি জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত চুল, নখ বা শরীরের কোনো পশম কাটবে না। ইসলামি শরিয়তে এটি মুস্তাহাব বা উত্তম আমল হিসেবে বিবেচিত।
হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যদি কোরবানি করার ইচ্ছা করে এবং জিলহজের চাঁদ দেখা যায়, তবে সে যেন কোরবানি করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।” (সহীহ মুসলিম)
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই আমলের পেছনে রয়েছে গভীর তাৎপর্য। কোরবানিদাতা ব্যক্তি যেন হজ পালনকারীদের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য বজায় রাখতে পারেন এবং ইবাদতের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেন—এ উদ্দেশ্যেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এটি ইহরামের মতো বাধ্যতামূলক বিধান নয়; বরং একটি ফজিলতপূর্ণ সুন্নাহ।
এ বিধান শুধু সেই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, যিনি নিজের নামে কোরবানি করবেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক নয়। কারণ হাদিসে “যে কোরবানি করতে চায়” বলে কোরবানিদাতাকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
তবে ইসলাম সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। যদি কেউ ভুলে, অজ্ঞতাবশত বা প্রয়োজনবশত চুল-নখ কেটে ফেলেন, তাহলে তার ওপর কোনো গুনাহ হবে না এবং কোরবানিও সহিহ হবে। কোনো কাফফারা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার নখ ভেঙে গেলে, চোখে চুল পড়ে কষ্ট হলে কিংবা চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন দেখা দিলে চুল বা নখ কাটা জায়েজ।
অন্যদিকে ইসলাম পরিচ্ছন্নতার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। হাদিসে এসেছে, গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা ও শরীরের অবাঞ্ছিত পশম পরিষ্কারের ক্ষেত্রে ৪০ দিনের বেশি বিলম্ব না করতে। তাই যদি ৪০ দিনের সীমা অতিক্রম হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা কেটে নেওয়া যাবে।
জিলহজের প্রথম ১০ দিন শুধু কোরবানির প্রস্তুতির সময় নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহামূল্যবান সুযোগ। এই সময় বেশি বেশি জিকির, দোয়া, দান-সদকা এবং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
