নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঈদুল আযহা ভাবনা
ঈদুল আযহা—মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। তবে এই উৎসব কেবলই আনন্দের নয়, এর মূল সুর লুকিয়ে আছে ত্যাগ, ভক্তি আর আত্মশুদ্ধির মাঝে। পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে নিজেদের ভাবনা, অনুভূতি ও দর্শনের কথা প্রকাশ করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) একদল শিক্ষার্থী। তাদের লেখনীতে উঠে এসেছে শৈশবের আনন্দ, ত্যাগের মহিমা, আধ্যাত্মিক চেতনা এবং সাম্যের এক অপূর্ব চিত্র।
আনন্দের কথা জানিয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সিফাত খান বলেন, “ঈদুল আযহা আমার কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, এটি ত্যাগ, ভালোবাসা আর একতার এক অপূর্ব মিলনমেলা।ঈদুল আযহার আগ মুহূর্তে গরুর হাটে যাওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা। বিভিন্ন আকারের, রঙের গরু-ছাগল দেখে পছন্দের কুরবানির পশুটি বেছে নেওয়ার মধ্যে একধরনের শিশুসুলভ আনন্দ কাজ করে। প্রতিটি দরদাম, প্রতিটি পছন্দের মুহূর্ত যেন ঈদের আনন্দকে আগেই ছুঁয়ে যায়।ঈদের দিন ভোরে এলাকার সবাই যখন একসাথে ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করি, তখন মনে হয় যেন সব ভেদাভেদ মুছে গিয়ে আমরা একই সুতোয় গাঁথা। নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী সবার সাথে কুশল বিনিময় করার সুযোগ হয়—যা সারা বছরে হয়তো হয় না।
নামাজের পর আসে ঈদের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত—কুরবানি। গরু, মহিষ, ছাগল কুরবানি করে আমরা সেই মাংস নিজেদের, আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজের অসহায় মানুষদের মাঝে ভাগ করে দিই। ধনী-গরিবের ব্যবধান যেন সেদিন মিলিয়ে যায়। প্রতিটি ঘরে যখন মাংসের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন বোঝা যায় ত্যাগের মাধ্যমে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা পৃথিবীর আর কোনো কিছুতে নেই।
এই দিনটি আমাকে শেখায়—ত্যাগ করলেই প্রকৃত শান্তি ও তৃপ্তি মেলে, এবং একসাথে ভাগ করে নিলেই আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়।”
চারুকলা সানজিদা শারমিন বলেন, “ঈদুল আজহা হলো ত্যাগ, ভক্তি ও আনন্দের এক অনন্য উৎসব, যা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার এক বড় মাধ্যম। পশু কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ করেন এবং আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখীদের মাঝে মাংস বিতরণের মাধ্যমে আনন্দের পরিবেশ তৈরি করেন।
ঈদুল আজহা হচ্ছে ঐক্যের প্রতীক, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই ঈদগাহে সমবেত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং নামাজ শেষে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কোরবানি করা বিষয়টি খুবই আনন্দের, এবং সেই মাংস গরীবদের মাঝে বিতরণ করার আনন্দ টা একটু বেশিই, ঐদিন সকলের মুখে হাসি এবং সন্তুষ্টির ছায়া দেখা যায়।
কোরবানি ঈদের দিন মজার মজার মাংসের খাবার তৈরি ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়।কোরবানির মাংস প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। কোরবানি ঈদ ত্যাগের মধ্য দিয়েই প্রকৃত আনন্দ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে আসে।”
ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাখাওয়াত হোসেন শিপু বলেন, “ঈদুল আজহা শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের এক মহান দিন। এই দিন আমাদের শেখায় নিজের স্বার্থ ভুলে অন্যের পাশে দাঁড়াতে। কুরবানির মাংস গরিব ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে সমাজে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সাম্যের বন্ধন গড়ে ওঠে।
এই উৎসব মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করে। ধনী-গরিব সবাই একসাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়া এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই কুরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত। কুরবানির ঈদ আমাদের শেখায়— মানবতা, ভ্রাতৃত্ব ও ত্যাগই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। কেননা, ভোগেই নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ।”
স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান জানান, “ঈদুল আযহার আগমনে মনের ভেতর এক অন্যরকম শিহরণ জাগে — আনন্দের সাথে মিশে থাকে এক পবিত্র বেদনা। এই ঈদ শুধু উৎসব নয়, আত্মার গভীরে পৌঁছানো এক আধ্যাত্মিক অনুভূতি।
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অসীম ত্যাগের স্মৃতি বুকে নিয়ে যখন কুরবানির দিন আসে, তখন মনে হয় — পশু কুরবানি তো শুধু প্রতীক, আসল কুরবানি হলো নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার আর স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া। ছুরি হাতে নেওয়ার মুহূর্তে তাই মনে মনে প্রশ্ন জাগে — আমার ভেতরে কী আছে যেটা আমি এখনো ছাড়তে পারিনি?
ঈদের ভোরে তাকবিরের সুর, আতরের সুবাস আর প্রিয়জনের উষ্ণ আলিঙ্গনে মনটা ভরে ওঠে। কুরবানির গোশত যখন গরিবের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়, সেই ভাগ করে নেওয়ার তৃপ্তি অতুলনীয়। ঈদুল আযহা আমাদের মনে করিয়ে দেয় — ভালোবাসা মানে আঁকড়ে ধরা নয়, হারানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের আরও এক শিক্ষার্থী আনিকা তাহসিন লাজুক ঈদুল আযহার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “ঈদুল আযহা আমাদের ত্যাগের মহিমা শেখায়, সেই সাথে দেখায় ধনী গরিবের অভূতপূর্ণ মিলন। আল্লাহ্ সুবাহানাল্লাহ তায়ালা সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উপর কুরবানী ওয়াজিব করেছেন। যার ফলে মুসলিমদের উপর ধর্মীয় ভাবেই এই দিনটি উদযাপন করা বাধ্যকতা হয়ে যায়।
আল্লাহ বলেন,”নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন এবং আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”— (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২)।
যারা পশু জবাইয়ের মাধ্যমে কুরবানী দেয় এবং গরিবদের মাঝে মাংস বিতরণ করে। এতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, যারা হয়তোবা সারা বছরেও মাংসের স্বাদ অনুভব করতে পারে না তারাও সেই সুযোগটি পাই। পরিবার পরিজনদের সাথে তারাও সামিল হয় এই দিনটিতে উদযাপন করতে।
পবিত্র ঈদুল আযহার মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ এবং ধনী – গরিব সাম্প্রদায়িকতা বোধ অনেকটায় হ্রাস পায়।”
তরুণ শিক্ষার্থীদের এই ভাবনাগুলো প্রমাণ করে যে, ঈদুল আযহা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি তরুণ প্রজন্মের মনে সামাজিক দায়বদ্ধতা, আত্মত্যাগ এবং সম্প্রীতির বীজ বুনে দেয়। এই ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক প্রতিটি মানুষের জীবন—এমনটাই প্রত্যাশা নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।
