প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার: ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৮৪০ সালে পদ্মা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯১৪ সালে এটি কেন্দ্রীয় কারাগারে উন্নীত হয়। প্রায় দুই শতকের পুরোনো এই কারাগারটি বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দির চাপ, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, জনবল সংকট ও বর্ষাকালের জলাবদ্ধতার মতো নানা সমস্যার মধ্যেও বন্দিদের জন্য মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৪৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষের জন্য ১ হাজার ৪১৯টি এবং নারীর জন্য ৪১টি আসন রয়েছে। বর্তমানে সেখানে বন্দি রয়েছেন ২ হাজার ৫৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ বন্দি ২ হাজার ৪২২ জন এবং নারী বন্দি ১১২ জন। ফলে একই অবকাঠামোয় ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দিকে রাখতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারাগারের তিনটি ভবন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ও ছাদ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বর্ষাকালে ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় কারাগারের ভেতরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে বন্দিদের চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
এদিকে কারাগারে প্রায় ২০০টি পদ শূন্য থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণ না হলে ভবিষ্যতে কারা ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর জেল সুপার আল মামুন বন্দিদের কল্যাণ ও কারাগারের পরিবেশ উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
বন্দিদের জন্য চালু করা হয়েছে “আমার শপ”, যেখানে বাইরের বাজারের তুলনায় কম দামে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য পাওয়া যায়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চালু হয়েছে জেন্টস পার্লার ও লন্ড্রি শপ। পাশাপাশি পুরোনো লাইব্রেরি সংস্কার করে বই পড়ার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
ধর্মীয় ও নৈতিক চর্চার অংশ হিসেবে যেসব বন্দি কোরআন তিলাওয়াত করতে পারেন, তাঁদের মাধ্যমে প্রতিদিন এক পারা কোরআন খতমের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বন্দিদের দক্ষতা উন্নয়নে কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণও চালু করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫০০ বস্তায় আদা চাষ করা হচ্ছে। মুক্তির পর এসব প্রশিক্ষণ বন্দিদের আত্মকর্মসংস্থানে সহায়ক হবে বলে আশা করছে কারা কর্তৃপক্ষ।
খাদ্যমান উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বন্দিদের জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সুষম খাবার নিশ্চিত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগের তুলনায় খাবারের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং অভিযোগ কমেছে।
বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য দাবা, লুডু, ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজনের পাশাপাশি বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। সংগীতচর্চার সুযোগও তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বড় প্রজেক্টরের মাধ্যমে খেলা দেখানোর উদ্যোগ বন্দিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণেও নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। ডেপুটি জেলারের জরাজীর্ণ কক্ষ সংস্কার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য শিশু পার্ক নির্মাণ, প্রধান ফটকের নামফলক সংস্কার, ১০টি ডাস্টবিন স্থাপন এবং ১৭৫টি ফলজ ও বনজ গাছ রোপণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার আল মামুন বলেন,
“রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি বন্দি রয়েছে। এর ফলে আমাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি বন্দিদের জন্য একটি মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে।”
তিনি আরও বলেন, “কারাগারের কিছু ভবন জরাজীর্ণ হয়ে গেছে এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রায় ২০০টি শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করা গেলে কারা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু বন্দিদের নিরাপদে রাখা নয়, তাদের সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সমাজে পুনর্বাসনের উপযোগী করে গড়ে তোলা।”
