নিকলী উপজেলা প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এখন যেন এক অনিশ্চয়তার প্রান্তর। উজানের পাহাড়ি ঢল আর টানা অতিবৃষ্টিতে পাকা ধান ডুবে যাওয়ার শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। চোখের সামনে সোনালি ফসল হারানোর আশঙ্কা—এই বাস্তবতায় অনেকেরই কপালে নেমে এসেছে হতাশার ছাপ।
এমন সময়েই হাওরের মাঠে ভিন্ন এক দৃশ্য চোখে পড়ছে। কাস্তে হাতে নেমে পড়েছেন একঝাঁক তরুণ। তারা কোনো পেশাদার শ্রমিক নন; তারা নিকলী উপজেলা ছাত্রদলের নেতা-কর্মী। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কৃষকের ধান কেটে দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, আকস্মিক ঢলে উপজেলার অধিকাংশ কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে না পারলে পুরো ফসল হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ মেশিনের সংকট, শ্রমিকের আকাশচুম্বী মজুরি এবং নৌকার স্বল্পতা কৃষকের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। যেখানে ধানের দাম মণপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, সেখানে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকা—যা অনেক কৃষকের পক্ষেই বহন করা প্রায় অসম্ভব।
এই কঠিন বাস্তবতায় ছাত্রদলের কর্মীরা মাঠে নেমে সরাসরি কৃষকদের সহায়তা করছেন। সংগঠনটির সাবেক আহ্বায়ক হৃদয় হাসানের নেতৃত্বে তারা দলবদ্ধভাবে ধান কেটে দিচ্ছেন। শুধু ধান কাটাই নয়, কাটা ধান নৌকায় করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কাজেও তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা কৃষকের ঘরে ফসল তুলে দেওয়ার কাজও করছেন।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, যখন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না এবং সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই তরুণদের উপস্থিতি তাদের জন্য আশার আলো হয়ে আসে। একজন কৃষক বলেন, “আমরা যখন ভেবেছিলাম সব শেষ, তখন তারা এসে আমাদের ধান কেটে দিয়েছে। এতে আমাদের বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছি।”

হৃদয় হাসান বলেন, “দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল দায়িত্ব। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই বিশ্বাস থেকেই আমরা মাঠে নেমেছি। যতদিন প্রয়োজন, আমরা এই কার্যক্রম চালিয়ে যাব।”
স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক সংগঠনের এমন মানবিক উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয়। হাওরের এই দুর্যোগকালে ছাত্রদলের কর্মীদের স্বেচ্ছাশ্রম কেবল কৃষকের ক্ষতি কমাতেই সহায়তা করছে না, বরং তরুণদের সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি উদাহরণ হিসেবেও সামনে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওরাঞ্চলে প্রতিবছরই এমন আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে যান্ত্রিক সহায়তা বাড়ানো, আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তবে তাৎক্ষণিক এই সংকটে মাঠপর্যায়ে ছাত্রদলের সক্রিয় অংশগ্রহণ কৃষকদের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

